হোয়াইট হাউসের কাছে গুলিবর্ষণের জের
মোস্তফা তারেক, নিউইয়র্ক: হোয়াইট হাউসের অদূরে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের ওপর গুলিবর্ষণ এবং এক সদস্যের নিহতের ঘটনার জেরে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এই ঘটনার পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন দেশটিতে সব ধরনের আশ্রয় প্রার্থনা এবং অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন প্রত্যাশী লাখো মানুষের ভাগ্য অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত
গত ২৬ নভেম্বর ২০২৫, বুধবার, হোয়াইট হাউসের নিরাপত্তা বলয়ের কাছে দায়িত্বরত দুই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে লক্ষ্য করে অতর্কিত গুলি চালানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই একজন নিহত হন এবং অন্যজন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে হামলাকারীকে গ্রেফতার করে। অভিযুক্তের নাম রহমানুল্লাহ লাকানওয়াল (২৬)। পুলিশ ও অভিবাসন আদালতের নথি থেকে জানা গেছে, লাকানওয়াল একজন আফগান নাগরিক, যিনি ২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে তাকে আইনগতভাবে আশ্রয় প্রদান করা হয়েছিল।
প্রশাসনের কঠোর প্রতিক্রিয়া
এই হামলার ঘটনার পরই ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস এক জরুরি ঘোষণায় জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সব ধরনের ‘আশ্রয়-দাবি’ এবং এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে।
প্রথমে নিষেধাজ্ঞাটি শুধুমাত্র আফগান নাগরিকদের জন্য কার্যকর করার কথা ভাবা হলেও, দ্রুতই তা সকল বিদেশি নাগরিকের জন্য সম্প্রসারিত করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে নতুন বা পুরনো—কোনো আবেদনেরই নিষ্পত্তি (অনুমোদন বা বাতিল) করা হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রত্যেক আবেদনকারীর ক্ষেত্রে ‘সর্বোচ্চ নিরাপত্তা যাচাই-বাছাই’ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এই পদক্ষেপকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য’ হিসেবে অভিহিত করেছে। প্রশাসনের এক মুখপাত্র জানান, “অনিচ্ছাকৃত বা ঝুঁকিযুক্ত কোনো অভিবাসনকে এই মুহূর্তে অনুমোদন দেওয়া হবে না।”
ঝুঁকিতে অভিবাসন ব্যবস্থা
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত কেবল নতুন আশ্রয়প্রার্থীদেরই ভোগাবে না, বরং যারা ইতোমধ্যে আবেদন করে ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের প্রক্রিয়াও পুরোপুরি থমকে যাবে।
ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন এই ঘটনাকে পুঁজি করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে বড় ধরনের কাঠামাগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু রাজনৈতিক আশ্রয়ের ক্ষেত্রে নয়, বরং ভিসা, গ্রিন কার্ড এবং অন্যান্য অভিবাসন অনুমোদনের ওপরও পড়বে। বিশেষ করে আফগানিস্তান এবং ‘তৃতীয় বিশ্বের’ দেশগুলো থেকে আগত অভিবাসীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও স্থায়ী হওয়ার পথ আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।
তীব্র সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া
একজন ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো অভিবাসী সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও অভিবাসন সংস্থা।
সমালোচকরা বলছেন, এক ব্যক্তির অপরাধের জেরে সামগ্রিক আশ্রয় প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেওয়া অনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের লঙ্ঘন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যারা নিজ দেশে নির্যাতন বা যুদ্ধের কারণে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় খুঁজছেন, তারা এখন দীর্ঘমেয়াদী আইনি জটিলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বেন।
ওয়াশিংটন ডিসির এই ঘটনা এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আগামী দিনগুলোতে দৃশ্যমান হবে।










