ভিসা জটে ভারতের পর্যটনে ধস
কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভিসা প্রাপ্তিতে জটিলতার জেরে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশি পর্যটকদের আনাগোনা তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যটির পর্যটন শিল্প। স্থানীয় ট্যুর অপারেটর ও ব্যবসায়ীদের মতে, আগে যেখানে পর্যটকদের ঢল নামত, এখন সেখানে বাংলাদেশি পর্যটক নেই বললেই চলে।
পর্যটকের সংখ্যায় ধস
পশ্চিমবঙ্গের ট্যুর অপারেটরদের দেওয়া তথ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভিসা কড়াকড়ির কারণে পর্যটনের চিত্রে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে গড়ে ১০০ জন বাংলাদেশি পর্যটক আসতেন, বর্তমানে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২-৩ জনে। অর্থাৎ পর্যটক আগমনের হার কমেছে প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ। বর্তমানে যারা আসছেন, তাদের সিংহভাগই মূলত চিকিৎসার প্রয়োজনে মেডিকেল ভিসায় ভারতে প্রবেশ করছেন।
ইস্টার্ন হিমালয় ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি দেবাশিস মৈত্র বলেন, ‘‘আগে বছরে প্রায় ছয় লাখের বেশি বাংলাদেশি পর্যটনের টানে আসতেন। এখন সেই সংখ্যাটা কমে এক-দেড় লাখে ঠেকেছে। বাংলাদেশি পর্যটক না আসায় পরিবহন থেকে শুরু করে ট্রাভেল এজেন্ট ও হোটেল—সব খাতেই প্রচুর ক্ষতি হচ্ছে।’’
জনপ্রিয় গন্তব্যগুলোতে হাহাকার
শীতের শুরুতে দার্জিলিং, গ্যাংটক এবং শান্তিনিকেতনের বোলপুর বাংলাদেশি পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে থাকত। বিশেষ করে পৌষমেলার সময় বোলপুরে বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড় ছিল এক চেনা দৃশ্য। কিন্তু এবারের পৌষমেলায় সেই চিত্র দেখা যাবে না বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ২০১৮ সালে সিকিম ভ্রমণের অনুমতি পাওয়ার পর সেখানেও বাংলাদেশিদের আগ্রহ বেড়েছিল, যা এখন স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিকল্প খুঁজছে পর্যটকরা
ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের ভ্রমণপিপাসুরা এখন বিকল্প গন্তব্যের দিকে ঝুঁকছেন। ট্যুর অপারেটররা জানান, মেডিকেল ভিসা ছাড়া টুরিস্ট ভিসা পাওয়া এখন অত্যন্ত দুরূহ। ফলে পর্যটকরা ভারতবিমুখ হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন—থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও মালদ্বীপের দিকে ঝুঁকছেন।
ইউরোপীয় পর্যটকে মিটছে না ঘাটতি
পশ্চিমবঙ্গে ইউরোপ, আমেরিকা বা ইংল্যান্ড থেকে পর্যটকরা এলেও তা দিয়ে বাংলাদেশি পর্যটকদের শূন্যস্থান পূরণ হচ্ছে না। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, পশ্চিমা পর্যটকরা সাধারণত দিল্লি হয়ে প্রবেশ করে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ বা উত্তরপ্রদেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলোতে বেশি যান। অন্যদিকে, বাংলাদেশিরা ভৌগোলিক নৈকট্য ও বাজেটের সুবিধার কারণে পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গেই বেশি ভ্রমণ করতেন।
হিমালয়ান হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক সম্রাট সান্যাল জানান, অন্যান্য দেশের পর্যটক আসায় সার্বিক ক্ষতি কিছুটা কম মনে হলেও, সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশি পর্যটকদের অনুপস্থিতি এই অঞ্চলের পর্যটন শিল্পকে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলে যদি আবারও সহজে টুরিস্ট ভিসা চালু হয়, তবেই পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন শিল্প তার হারানো জৌলুস ফিরে পাবে।










