পাহাড়ের চূড়ায় প্রশান্তির নীড়
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, আনোয়ারা: কর্ণফুলী নদীর ওপারে তখন গোধূলির আলো। সবুজে মোড়ানো পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে ওপরে উঠতেই কানে আসে অদ্ভুত এক নীরবতা, যা কেবল পাখির ডাক আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দে ভাঙে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার দেয়াং পাহাড়ের চূড়ায় এভাবেই সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান ঐতিহাসিক ‘মরিয়ম আশ্রম’। এটি কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এই মাটির সাথে মিশে আছে পূর্ববঙ্গের প্রথম গির্জা আর হাজারো শহীদের রক্তমাখা ইতিহাস।
রক্তাক্ত ইতিহাস ও পুনর্জাগরণ
মরিয়ম আশ্রমের ইতিহাস প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৫১৮ সালে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামে আসার পর দেয়াং পাহাড়ে তাদের বসতি গড়ে তোলে। ১৫৯৯ সালে ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ এবং ফাদার আন্দ্রে বোভেস আরাকান রাজার অনুমতি নিয়ে এই স্থানেই পূর্ববঙ্গের প্রথম গির্জা বা উপাসনালয় নির্মাণ করেন। তখন এর নাম ছিল ‘চান্দার গির্জা’ বা ‘ব্যান্ডেল চার্চ’।
কিন্তু ১৬০২ সালে আরাকান রাজা ও পর্তুগিজদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলে আরাকানরা এই গির্জা পুড়িয়ে দেয় এবং বহু খ্রিস্টান পাদ্রী ও ভক্তকে হত্যা করে। মাটির সাথে মিশে যায় সেই ঐতিহাসিক স্থাপনা। দীর্ঘকাল এটি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকার পর, বিংশ শতাব্দীতে ফাদার জুমেন ও স্থানীয় খ্রিস্টান ভক্তদের প্রচেষ্টায় এই ধ্বংসাবশেষ পুনরাবিষ্কৃত হয় এবং গড়ে তোলা হয় বর্তমানের ‘মরিয়ম আশ্রম’।
বাংলার প্রথম শহীদ ও ফাদার ফ্রান্সেসকো
এই আশ্রমের মাটির সাথে জড়িয়ে আছে বাংলার প্রথম খ্রিস্টান শহীদের স্মৃতি। ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ, যিনি এই গির্জাটি স্থাপন করেছিলেন, তাঁকে আরাকান সেনারা বন্দি করে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে। ১৪ নভেম্বর ১৬০২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে এই দেয়াং পাহাড়েই সমাহিত করা হয় বলে ধারণা করা হয়। তাই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই স্থানটি ‘পুণ্যভূমি’ হিসেবে বিবেচিত।
তীর্থোৎসব: ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে মিলনমেলা
সারা বছর আশ্রমটি নীরব থাকলেও প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে এখানে বসে মানুষের ঢল। অনুষ্ঠিত হয় বাৎসরিক ‘তীর্থোৎসব’। ফাদার ফ্রান্সেসকো ফার্নান্দেজ এবং মা মারিয়ার সম্মানে আয়োজিত এই উৎসবে চট্টগ্রাম ছাড়াও ঢাকা, খুলনা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত সমবেত হন। তখন পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে প্রার্থনা সংগীতে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে স্থানীয় মানুষরাও এই উৎসবের আমেজে শরিক হন।
পাহাড়ের চূড়ায় স্বর্গীয় সৌন্দর্য
মরিয়ম আশ্রমের পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করবে। মূল ফটক দিয়ে ঢুকলেই চোখে পড়ে যিশুমাতা মরিয়মের একটি ধবধবে সাদা ভাস্কর্য, যা দুই হাত প্রসারিত করে স্বাগত জানাচ্ছে। আশ্রমের ভেতরে রয়েছে ‘লুর্দের রানীর পাহাড়’ বা গ্রোটো, যেখানে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করেন ভক্তরা।
এই আশ্রমের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। গির্জার সামনে দাঁড়ালে এক নজরে দেখা যায় একদিকে কর্ণফুলী নদীর মোহনা, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি। এখান থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য এক কথায় জাদুকরী। চারপাশের ঘন জঙ্গল, ঠান্ডা বাতাস আর আধ্যাত্মিক আবহ মিলেমিশে এক প্রশান্তির সৃষ্টি করে।
পর্যটক ও দর্শনার্থীদের জন্য
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে যে কেউ মরিয়ম আশ্রম পরিদর্শন করতে পারেন। তবে যেহেতু এটি একটি উপাসনালয় এবং সন্ন্যাসিনীদের আবাসস্থল, তাই এখানে উচ্চস্বরে কথা বলা বা হইচই করা নিষিদ্ধ। বর্তমানে আশ্রমটি ‘ব্রাদারহুড অব হলিক্রস’ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
যাবেন কীভাবে
চট্টগ্রাম শহর থেকে শাহ আমানত সেতু (নতুন ব্রিজ) পার হয়ে বা টানেল দিয়ে আনোয়ারা চাতুরী চৌমুহনী আসতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশা যোগে কোরিয়ান ইপিজেড-এর ভেতর দিয়ে বা বিকল্প পথে দেয়াং পাহাড়ের মরিয়ম আশ্রমে যাওয়া যায়।
দেয়াং পাহাড়ের মরিয়ম আশ্রম কেবল ইটের গাঁথুনি নয়, এটি বিশ্বাস আর ইতিহাসের এক অনন্য মেলবন্ধন। শহরের ক্লান্তি ভুলে কেউ যদি ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে চান এবং প্রকৃতির কোলে নিজেকে সঁপে দিতে চান, তবে মরিয়ম আশ্রম হতে পারে এক আদর্শ গন্তব্য।










