নীরব জোন, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় শব্দসীমা
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশের নগর জীবনে শব্দদূষণের মাত্রা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজের ভারী যন্ত্রপাতি, বাণিজ্যিক এলাকার ভিড় এবং উৎসবমুখর লাউডস্পিকার—সব মিলিয়ে নগরের প্রকৃতি বহু বছর ধরেই বিরক্তিকর শব্দে দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি করেছে। এই বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যেই সরকার শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫ জারি করেছে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি–ভিত্তিক শব্দসীমা নির্ধারণ।
বিধিমালাটি স্পষ্টভাবে চারটি এলাকা চিহ্নিত করেছে—
১. নীরব জোন
২. আবাসিক এলাকা
৩. বাণিজ্যিক এলাকা
৪. শিল্প এলাকা
এতে প্রতিটি অঞ্চলের বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে শব্দসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নীরব জোন
হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোম, বিদ্যালয়, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান—সবগুলো জায়গা নীরব জোনের আওতায় আসবে। এই এলাকায় অপ্রয়োজনীয় শব্দ সৃষ্টিকারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার, হর্ন বাজানো বা লাউডস্পিকার ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
রোগী, শিক্ষার্থী ও গবেষণার পরিবেশ সুরক্ষার জন্য এখানে শব্দসীমা সবচেয়ে কম রাখা হয়েছে। এমনকি রাস্তার পাশে হঠাৎ বিকট শব্দ সৃষ্টি করলেও জরিমানার ব্যবস্থা থাকছে।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, নীরব জোনের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো ধরনের উচ্চ শব্দ করা যাবে না। প্রয়োজনে এসব এলাকার পাশে শব্দনিয়ন্ত্রণ ব্যারিয়ার স্থাপন করা হবে।
আবাসিক এলাকা
আবাসিক এলাকায় মানুষের বিশ্রাম, ঘুম, পারিবারিক শান্তি বজায় রাখতে শব্দসীমা আরও নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পরে কোনো রকম উচ্চ শব্দে গান বাজানো, ডিজে পার্টি, পাড়া–মহল্লায় মাইক ব্যবহার, গ্যারেজে অতিরিক্ত শব্দে যন্ত্র চালানো—সবকিছুই আইনত দণ্ডনীয়।
আগের আইনেও কিছু নিষেধাজ্ঞা ছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন ছিল দুর্বল। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী এখন স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে।
শিশুদের পড়াশোনার সময়, বয়স্ক মানুষের বিশ্রাম এবং পরিবার–কেন্দ্রিক জীবনযাপন যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি বিধিমালায় গুরুত্ব পেয়েছে।
বাণিজ্যিক এলাকা
বাজার, শপিং মল, অফিস, ব্যস্ত রাস্তা—স্বাভাবিকভাবেই বাণিজ্যিক এলাকা শব্দপ্রবণ। তবে নতুন বিধিমালায় বলা হয়েছে, এখানে শব্দ বাড়লেও তা যেন নির্দিষ্ট সীমা ছাড়িয়ে না যায়।
দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে শব্দনিরোধক ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাউন্ড সিস্টেমের ভলিউম নিয়ন্ত্রিত না থাকলে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
রাতের বাণিজ্যিক কার্যক্রমও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে থাকতে হবে। বাণিজ্যিক এলাকা যাতে আবাসিক এলাকার শান্তি নষ্ট না করে, সেজন্য দুটির মধ্যকার সীমান্ত এলাকাকে বিশেষভাবে মনিটরিং করা হবে।
জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় নিয়মগুলো অত্যন্ত জরুরি
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দের মধ্যে থাকলে হৃদরোগ, রক্তচাপ, মানসিক চাপ, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং ঘুম ব্যাহত হওয়া—এসব সমস্যা মারাত্মকভাবে বেড়ে যায়।
তাই নতুন বিধিমালা শুধু “শব্দ নিয়ন্ত্রণ” নয়, বরং “স্বাস্থ্য সুরক্ষা” নীতির অংশ হিসেবেও বিবেচিত।
বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ
নতুন বিধিমালা নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী। কিন্তু বাস্তবে এটি কার্যকর করতে হবে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, ট্রাফিক পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও নাগরিকদের সমন্বয়ে।
শুধু আইন থাকলেই হবে না—মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন, যাতে তারা বুঝতে পারে শব্দদূষণ শুধু অসুবিধা নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যগত হুমকি।










