Home কক্সবাজার চার ভাগে সেন্ট মার্টিন: কোথায় ঘুরবেন, কোথায় নিষিদ্ধ?

চার ভাগে সেন্ট মার্টিন: কোথায় ঘুরবেন, কোথায় নিষিদ্ধ?

‘বাঁচবে প্রবাল, বাঁচবে দ্বীপ: সেন্ট মার্টিনের আগামীর রূপরেখা’
পর্ব-৩


 কামরুল ইসলাম, ঢাকা: সেন্ট মার্টিন মানেই কি পুরো দ্বীপ জুড়ে অবাধ বিচরণ? ইচ্ছে হলো তো বাইসাইকেল চালিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেলেন, কিংবা ছেঁড়া দ্বীপে গিয়ে তাঁবু টাঙালেন? মাস্টার প্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই স্বাধীনতা আর থাকছে না। দ্বীপের প্রবাল ও জীববৈচিত্র্য বাঁচাতে পুরো সেন্ট মার্টিনকে চারটি আলাদা জোনে ভাগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র একটি জোনে পর্যটকরা থাকার সুযোগ পাবেন, বাকিগুলোতে বিচরণ হবে সীমিত কিংবা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের খসড়া মাস্টার প্ল্যানের ৫ম অধ্যায়ে এই ‘জোনিং’ বা এলাকা বিভাজনের বিস্তারিত রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

জোন-১: সাধারণ ব্যবহারের এলাকা (General Use Zone)

অবস্থান: দ্বীপের উত্তর দিকের অংশ (উত্তর পাড়া ও সংলগ্ন এলাকা)। জেটি ঘাট থেকে শুরু করে জনবসতিপূর্ণ এলাকাটি এর অন্তর্ভুক্ত।

কী করা যাবে: এটিই হবে দ্বীপের ‘ট্যুরিজম হাব’। পর্যটকদের জন্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ এবং প্রশাসনিক অফিসগুলো কেবল এই জোনেই থাকবে। সৈকত সংলগ্ন ৪.১ কিলোমিটার এলাকা পর্যটকদের বিচরণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

শর্ত: এখানেও নতুন করে বহুতল ভবন করা যাবে না। বিদ্যমান স্থাপনাগুলোকে পরিবেশবান্ধব হতে হবে। রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো বা হইচই করা নিষিদ্ধ থাকবে।

জোন-২: বাফার জোন বা নিয়ন্ত্রিত এলাকা (Controlled Zone)

অবস্থান: জোন-১ এর ঠিক পরেই, দ্বীপের মধ্যবর্তী অংশ। এটি মূলত কৃষি জমি এবং বসতি ও সংরক্ষিত এলাকার মাঝখানের অংশ।

কাজ: এই এলাকাটি উত্তরের পর্যটন এলাকা এবং দক্ষিণের সংরক্ষিত এলাকার মধ্যে ‘দেয়াল’ বা বাফার হিসেবে কাজ করবে।

বিধিনিষেধ: এখানে কোনো নতুন রিসোর্ট বা হোটেল তৈরি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই এলাকায় অর্গানিক কৃষি (যেমন তরমুজ চাষ) এবং সীমিত পরিসরে স্থানীয়দের বসবাসের অনুমতি থাকবে। পর্যটকরা এখানে দিনের বেলা যেতে পারলেও রাতে অবস্থান করতে পারবেন না।

জোন-৩: টেকসই ব্যবহার এলাকা (Sustainable Use Zone)

অবস্থান: দক্ষিণ পাড়া এবং এর আশেপাশের এলাকা।

গুরুত্ব: এটি কচ্ছপের ডিম পাড়ার স্থান এবং ম্যানগ্রোভ বনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা।

বিধিনিষেধ: জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পর্যটকদের প্রবেশাধিকার এখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। বিশেষ অনুমতি ছাড়া এখানে প্রবেশ নিষেধ হতে পারে। কোনো ধরনের যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল বা উচ্চ শব্দ সৃষ্টি করা যাবে না। স্থানীয় জেলেরা সনাতন পদ্ধতিতে এখানে মাছ ধরতে পারবেন, তবে বানিজ্যিক ট্রলার নিষিদ্ধ।

জোন-৪: সংরক্ষিত এলাকা (Strict Nature Reserve)

অবস্থান: দ্বীপের সর্বদক্ষিণের অংশ, যা পর্যটকদের কাছে ‘ছেঁড়া দ্বীপ’ বা ছেঁড়াদিয়া নামে পরিচিত এবং এর সংলগ্ন সমুদ্র এলাকা।

কী হবে: এটি হবে দ্বীপের ‘নো-গো জোন’ (No-Go Zone)। মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী, এই এলাকাটি প্রবাল ও সামুদ্রিক শৈবালের জন্য সংরক্ষিত।

বিধিনিষেধ: এখানে সাধারণ পর্যটকদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কোনো নৌকা বা ট্রলার এই এলাকার ১০০০ মিটারের মধ্যে মাছ ধরতে বা নোঙর করতে পারবে না। শুধুমাত্র গবেষকরা বিশেষ অনুমতি নিয়ে এখানে যেতে পারবেন। অর্থাৎ, ছেঁড়া দ্বীপে গিয়ে ছবি তোলা বা বারবিকিউ পার্টির দিন শেষ হতে চলেছে।

ভবন নির্মাণে ‘উল্লম্ব সবুজায়ন’ (Vertical Greening System)
শুধু জোন ভাগ করাই নয়, মাস্টার প্ল্যানে অবকাঠামো নির্মাণেও আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। জোন-১ এ যেসব ভবন থাকবে, সেগুলোতে ‘ভার্টিক্যাল গ্রিনিং সিস্টেম’ (VGS) বা উল্লম্ব সবুজায়ন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
সহজ কথায়, ভবনের দেয়াল ও ছাদে লতাপাতা বা গাছ লাগানো থাকবে, যা দ্বীপের তাপমাত্রা কম রাখতে সাহায্য করবে। এছাড়া পাকা রাস্তার বদলে ব্যবহার করা হবে ‘কুল পেভমেন্ট’ (Cool Pavement) প্রযুক্তি, যা সূর্যের তাপ শোষণ না করে প্রতিফলিত করবে।

বাস্তবায়ন ও চ্যালেঞ্জ
জোনিং ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে দ্বীপের সীমানা নির্ধারণ এবং কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। মাস্টার প্ল্যানের চিত্র ৫.১-এ এই জোনগুলোর ম্যাপ দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যটকদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে রাখতে পারলে দ্বীপের বাকি অংশের প্রকৃতি নিজের ক্ষত সারিয়ে নিতে পারবে।

তবে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, ছেঁড়া দ্বীপ বন্ধ হলে পর্যটকরা বিমুখ হতে পারেন। অন্যদিকে পরিবেশবাদীদের দাবি, ছেঁড়া দ্বীপ না বাঁচলে সেন্ট মার্টিনই বাঁচবে না।