বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ: সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বাংলাদেশের প্রাণিসম্পদ খাতে দেশীয় জাতের অবদান দীর্ঘদিনের। গরু, ছাগল, ভেড়া এবং দেশি মুরগি, এসব প্রাণী দেশের আবহাওয়া, খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক ক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়েছে। তাই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, কম খাদ্যে টিকে থাকা এবং স্থানীয় পরিবেশে উৎপাদন বজায় রাখা, এই তিনটি বৈশিষ্ট্য দেশীয় জাতকে এখনো গ্রামীণ অর্থনীতির মূল ভিত্তিতে পরিণত করেছে।
দেশীয় গরু বাংলাদেশের প্রথাগত পশুপালনের প্রতীক। বড় আকার না হলেও তাদের রোগ সহনশীলতা শক্তিশালী। কম খাদ্যেও টিকে থাকে এবং খামারি পর্যায়ে পরিচালনায় সহজ। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্নত জাতের গরুর তুলনায় স্থানীয় জাত তাপমাত্রার ওঠানামা ভালোভাবে সহ্য করতে পারে। বর্তমান সময়ে দেশীয় জাতকে আরও উন্নত করতে কৃত্রিম প্রজনন, সংকরায়ন পদ্ধতি এবং গবেষণাগারে জেনেটিক বিশ্লেষণের কাজ চলেছে।
ছাগলজাত প্রাণীর মধ্যে দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাত হিসেবে পরিচিত। বিশ্বব্যাপীও এটি স্বীকৃত একটি মহামূল্যবান জাত। এর মাংস সুস্বাদু, বাজারমূল্য বেশি এবং বাচ্চা উৎপাদনের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। গবেষকরা বলছেন, ব্ল্যাক বেঙ্গলের জেনেটিক গুণাবলি বজায় রেখে উৎপাদন বাড়ানো গেলে এটি দেশের মাংস উৎপাদন খাতের জন্য আরও বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
দেশীয় ভেড়া দেশজ আবহাওয়ায় জন্মানো একটি বহুমুখী প্রাণী। কম খরচে পালনযোগ্য এবং বিভিন্ন জলবায়ুতে টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি হওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলসহ নানা স্থানে এর চাহিদা বাড়ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশীয় ভেড়ার খাদ্য রূপান্তর হার অপেক্ষাকৃত ভালো এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে দেশি মুরগি বাংলাদেশের গ্রামীণ পোলট্রির পরিচিত মুখ। খোলা আকাশে পালিত এসব মুরগি রোগ কমে আক্রান্ত হয় এবং বাজারে “নেটিভ চিকেন” হিসেবে তাদের চাহিদা সবসময়ই বেশি। যদিও উৎপাদন কম, তবু স্বাদ এবং স্বাস্থ্যগত সুবিধার কারণে এর বাজারমূল্য স্থিতিশীল। দেশীয় মুরগির উন্নয়নেও এখন চলছে জেনেটিক নির্বাচন, সংকরায়ন এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা।
গবেষকদের মতে, দেশীয় জাত সংরক্ষণ করা শুধু ঐতিহ্যের বিষয় নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা ভবিষ্যতেও নিশ্চিত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ, আমদানি নির্ভরতার ঝুঁকি এবং রোগবালাইয়ের বিস্তারের মতো পরিস্থিতিতে দেশীয় জাতই সবচেয়ে টেকসই সমাধান দিতে পারে।
প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন দেশীয় জাতের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, জেনেটিক মূল্যায়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির উপর দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই কাজ অব্যাহত থাকলে কৃষক ও দেশ—উভয়ই উপকৃত হবে এবং প্রাণিসম্পদ খাত আরও স্থিতিশীল ভিত্তির উপর দাঁড়াবে।
এই সিরিজের পরবর্তী পর্বে থাকছে আধুনিক প্রযুক্তি ও স্মার্ট ফার্মিং নিয়ে বিশ্লেষণ।










