অনলাইনে শাড়ি বিক্রির নামে এই ‘আধা-হাত’ জালিয়াতি এখন ঘরে ঘরে দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ‘নীলচুড়ি’ (একটি উদাহরণ মাত্র)-র মতো কিছু অনলাইন পেজের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পাহাড় জমেছে।
বিজ্ঞাপনের চকমকানি বনাম বাস্তবতার তফাৎ
অনলাইনে শাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপনে সাধারণত শাড়ির বুনন, রঙ বা পাড় নিয়ে অনেক চটকদার কথা লেখা থাকে। কিন্তু একটি শাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—সেটি লম্বায় কত হাত বা তার ‘বহর’ (উচ্চতা) কতটুকু, তা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
আমাদের দেশের একজন সাধারণ উচ্চতার নারীর জন্য অন্তত ১২ হাত বা সাড়ে পাঁচ মিটার দৈর্ঘ্যের শাড়ি প্রয়োজন। অথচ প্রতারক চক্রগুলো যে শাড়িগুলো ডেলিভারি দিচ্ছে, তা টেনেটুনে ১০ বা সাড়ে ১০ হাত। উচ্চতাও এতই কম যে তা পরলে ঠিকঠাক কুঁচি দেওয়া বা আঁচল রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শতকরা ৯০ জন নারীর জন্যই এই মাপের শাড়িগুলো পুরোপুরি অনুপযোগী। তবুও কম দামে ভালো মানের শাড়ি দেওয়ার নাম করে সাধারণ ক্রেতাদের পকেট থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে এই অসাধু চক্রগুলো।
অনলাইনে যেভাবে চলে এই ‘সুক্ষ্ম’ প্রতারণা
আমাদের অনুসন্ধানে অনলাইন শাড়ি ব্যবসার তিনটি অন্ধকার দিক উঠে এসেছে–
দৈর্ঘ্যে কারচুপি: ভালো মানের এক ভরি বা তার বেশি ওজনের সুতোর সাশ্রয় করতে তাঁতিদের দিয়ে কম দৈর্ঘ্যের শাড়ি তৈরি করা হয়। ১২ হাতের জায়গায় ১০ হাত শাড়ি বুনলে প্রতি ১০টি শাড়িতে প্রায় দুটি শাড়ির সুতো সাশ্রয় হয়। এই সাশ্রয় করা সুতোই মূলত ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার উৎস।
ছবি বনাম বাস্তব: বিজ্ঞাপনে যে শাড়িটি দেখানো হয়, সেটি হয়তো কোনো বড় ব্র্যান্ডের আসল শাড়ি। কিন্তু ডেলিভারির সময় দেওয়া হয় সেটিরই একটি সস্তা এবং ছোট মাপের ‘কপি’ সংস্করণ। সাধারণ ক্রেতারা ছবির সাথে রঙের মিল দেখে সহজেই প্রতারিত হন।
রিটার্ন বা অভিযোগের সুযোগ নেই: অনেক পেজ ডেলিভারি দেওয়ার পর ক্রেতাকে ব্লক করে দেয় অথবা অভিযোগ করলে বলে, ‘শাড়িটি ফ্রি-সাইজ, সবাই তো পরছে’। অথচ শাড়ির তো আর লিনজারি বা গেঞ্জির মতো স্ট্রেচেবল হওয়ার সুযোগ নেই।
প্রতারণা এড়াতে যা করবেন
একটি শাড়ি কেনার আগে কেবল দাম বা রঙ না দেখে নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়ে নিন:
মাপ জেনে নিন: অর্ডার করার আগে ইনবক্সে পরিষ্কারভাবে জিজ্ঞেস করুন শাড়িটি লম্বায় কত হাত এবং উচ্চতায় (বহর) কত ইঞ্চি। যদি তারা নিশ্চিত করে বলতে না পারে, তবে সেই পেজ থেকে কেনা এড়িয়ে চলুন।
ক্যাশ অন ডেলিভারি: চেষ্টা করুন ক্যাশ অন ডেলিভারিতে শাড়ি নিতে। ডেলিভারি ম্যানের সামনেই ফিতে দিয়ে মেপে দেখা সম্ভব না হলেও, শাড়িটি নিজের উচ্চতার সাথে মিলিয়ে অন্তত বহরটুকু পরখ করে নিন।
রিভিউ যাচাই: পেজের রিভিউ সেকশনে গিয়ে দেখুন অন্য ক্রেতারা মাপ নিয়ে কোনো অভিযোগ করেছেন কি না। মনে রাখবেন, ১০০টি ভালো কমেন্টের ভিড়ে মাপ নিয়ে করা ৫টি নেতিবাচক কমেন্টই আসল সত্য বলে দেয়।
অনলাইন কেনাকাটা আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু কিছু অসাধু পেজের কারণে পুরো ই-কমার্স খাত আজ আস্থার সংকটে। কেবল শৌখিনতার বশে টাকা দিয়ে কেনা শাড়িটি যদি আলমারির এক কোণে পড়ে থাকে, তবে সেটি আপনার পকেটে সিঁধ কাটারই নামান্তর। আপনার অধিকার ক্ষুণ্ণ হলে দমে যাবেন না। অভিযোগ করুন ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অথবা তাদের ফেসবুক পেজে প্রমাণসহ মেসেজ দিন।