কামরুল ইসলাম
২৩ জানুয়ারি, শুক্রবার খবরটা যখন কানে এলো, কয়েক ঘণ্টা আমি নিস্তব্ধ হয়ে বসে ছিলাম। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলাচলে বারবার মনে হচ্ছিল—মোজাফফর রাহমান বাদলের তো এভাবে চলে যাওয়ার কথা ছিল না। আগের দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সে পরপারের ডাক শুনে চলে গেছে। দীর্ঘ চার দশকের এক নিবিড় সম্পর্কের সুতো মুহূর্তেই ছিঁড়ে গেল।
বাদলের সাথে আমার পরিচয় আশির দশকে। তখন আমি সংবাদ-এর বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার, আর বাদল কুষ্টিয়ার সাপ্তাহিক ‘জাগরণী’তে। জাগরণী সম্পাদক আবদুর রশিদ চৌধুরীর স্নেহে আমাদের সেই বন্ধুত্বের শুরু। জগতি গ্রামের সেই মেঠোপথ, মনোয়ার হোসেন রানাদের বাড়িতে আড্ডা, ৯ জে এন মজুমদার লেনের সেই বাড়ি, বাদলের সেই কবিতা চর্চার দিনগুলো আজ স্মৃতির পাতায় জীবন্ত হয়ে উঠছে। আমরা দুজনে একসময় বগুড়া, রাজশাহী, নওগাঁসহ কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। সাংবাদিকতা ছেড়ে এলজিইডির চাকরিতে থিতু হলেও বাদলের মনের ভেতর সেই পুরনো আড্ডাবাজ মানুষটি সবসময় বেঁচে ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সাল বাদলের জীবনে এক কালবৈশাখী হয়ে আসে। অনলাইন জুয়ার মরণনেশায় পড়ে সে এক বিশাল অংকের অর্থ হারায়। সেই টাকা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা তাকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। এরপরের ঘটনাটি ছিল আরও ভয়াবহ এবং অমানবিক। যে নিকটজনদের সে পরম বিশ্বাস করত, তাদেরই চক্রান্তে সে একদল সন্ত্রাসীর হাতে অপহৃত হয়। শুধু শারীরিক নির্যাতন আর অপমানই নয়, চক্রান্তকারীরা কৌশলে তার ব্যাংকের গচ্ছিত সব অর্থ হাতিয়ে নেয়। এটা তার মুখে শোনা।
এই জোড়া ধাক্কা বাদল নিতে পারেনি। মানসিকভাবে সে একেবারে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। সেই সচ্ছল বাদল চিকিৎসার ন্যূনতম সামর্থ্য পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছিল। রোগব্যাধি যখন তার শরীরে বাসা বাঁধল, তখন তার পাশে দাঁড়ানোর মতো সেই আগের পরিবেশ আর ছিল না। কুষ্টিয়া আর রাজবাড়ীতে রাজপ্রাসাদতুল্য দুটি বাড়ি থাকলেও, শেষ দিনগুলোতে আমার বন্ধুটি ছিল চরম অসহায়, নিঃস্ব এবং একা। যন্ত্রণার এক পাহাড় বুকে চেপে তাকে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে হয়েছে।
১৯৯০-এর পর আমাদের সরাসরি যোগাযোগ সীমিত হলেও টেলিফোনে যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। ২০২৫-এর মাঝামাঝি কোনো একটি বিষয়ে সামান্য অভিমানে আমাদের কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। আজ সেই তুচ্ছ অভিমান পাহাড়সম অপরাধবোধ হয়ে আমাকে চেপে ধরছে। কেন সেই অভিমান ভেঙে একবার কথা বললাম না? শেষবার ২০২৩-এ মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য দেখা হয়েছিল—কে জানত সেটাই হবে শেষ বিদায়!
বিদায় বন্ধু। বৈভব আর যন্ত্রণার এই অদ্ভুত বৈপরীত্য ছেড়ে তুমি এখন না ফেরার দেশে। শেষ সময়ে যে অবিচার আর অবমাননা তুমি সয়েছো, তার বিচার হয়তো এ পৃথিবীতে হলো না, কিন্তু পরম করুণাময় তোমাকে শান্তিতে রাখবেন। আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তোমার স্মৃতিগুলো আমার কাছে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।










