ফরিদুল আলম, ঢাকা: গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগির রোগ নিরাময় এবং দ্রুত বর্ধনশীল করার লক্ষ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। সঠিক নিয়মনীতি না মেনে এই জীবনরক্ষাকারী ওষুধের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে এর অবশিষ্টাংশ সরাসরি চলে আসছে মানুষের খাদ্যতালিকায় থাকা মাংস, দুধ ও ডিমে। যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ বা অবশিষ্টাংশ কী?
যখন কোনো প্রাণীকে অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন বা খাবারের সাথে দেওয়া হয়, তখন সেটি ওই প্রাণীর শরীরের বিভিন্ন কোষে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিটি ওষুধের একটি নির্দিষ্ট সময় থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তা শরীরের টিস্যুতে অবস্থান করে। যদি সেই সময় পার হওয়ার আগেই প্রাণীকে জবাই করা হয় বা তার দুধ ও ডিম সংগ্রহ করা হয়, তবে ওই খাদ্যে ওষুধের অবশিষ্টাংশ বা ‘রেসিডিউ’ থেকে যায়।
প্রত্যাহারকাল (Withdrawal Period) কেন গুরুত্বপূর্ণ?
প্রত্যাহারকাল হলো অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের শেষ দিন থেকে ওই প্রাণীর পণ্য (মাংস, দুধ বা ডিম) মানুষের খাওয়ার উপযোগী হওয়ার মধ্যবর্তী সময়। বিভিন্ন ওষুধভেদে এই সময়সীমা ৩ দিন থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত হতে পারে।
বিপত্তি যেখানে: অধিকাংশ খামারি অসচেতনতা বা অধিক মুনাফার আশায় এই প্রত্যাহারকাল মেনে চলেন না। ফলে অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত খাবার সরাসরি মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।
রান্নার প্রভাব: অনেকে মনে করেন উচ্চতাপে রান্না করলে অ্যান্টিবায়োটিক ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক রান্নার সাধারণ তাপেও সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স
খাবারের মাধ্যমে শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিকভাবে হয়তো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ভয়াবহ:
১. অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স: এটি সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। যখন মানুষ নিয়মিত স্বল্পমাত্রায় খাবারের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে, তখন তার শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াগুলো ওই ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে। ফলে ভবিষ্যতে ওই ব্যক্তি যখন সত্যিই অসুস্থ হন, তখন সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক আর তার শরীরে কাজ করে না।
২. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি: লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া এবং অ্যালার্জির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. ক্যান্সারের ঝুঁকি: কিছু নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক অবশিষ্টাংশ কার্সিনোজেনিক বা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
প্রতিকারের উপায়
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় খামারি এবং ভোক্তা উভয়কেই সচেতন হতে হবে। রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্রাণীকে ওষুধ খাওয়ানো বন্ধ করতে হবে এবং ওষুধের প্যাকেটে উল্লেখিত প্রত্যাহারকাল কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। সরকার ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে যাতে অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত ক্ষতিকর মাংস বা ডিম বাজারে আসতে না পারে।
নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ নিশ্চিত করতে প্রত্যাহারকাল মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।










