বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে অসংক্রামক রোগ এখন আর কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং এক ভয়াবহ ‘নীরব মহামারী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এক সময় উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসকে শহুরে জীবনধারার রোগ মনে করা হলেও বর্তমানে গ্রামের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী অজান্তেই এই ঘাতক ব্যাধিগুলো বহন করে বেড়াচ্ছেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মেডিকেল জার্নাল ‘ক্লিনিক্যাল ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড গ্লোবাল হেলথ’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই উদ্বেগের চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণার ভয়াবহ তথ্য
পাবনার চাটমোহর ও দিনাজপুরের বিরল উপজেলায় পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০.৩ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। অর্থাৎ, প্রতি ৫ জন গ্রামবাসীর মধ্যে ১ জন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। পাশাপাশি ৮.৬ শতাংশ মানুষের শরীরে বাসা বেঁধেছে ডায়াবেটিস এবং ৩.৭ শতাংশ মানুষ স্থায়ী কিডনি রোগে আক্রান্ত।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, আক্রান্তদের অধিকাংশেরই ধারণা ছিল না যে তারা অসুস্থ। গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি (৫৩%) মানুষের রোগটি ইতিমধ্যে জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। সঠিক সময়ে শনাক্ত না হওয়ায় এই বিশাল জনগোষ্ঠী হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি বিকল হওয়ার মতো চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।
‘ওয়ান ডলার স্ক্রিনিং’ মডেল
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন প্রবাসী চিকিৎসক ও গবেষক ডাঃ আহমেদ শরীফের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় একটি সাশ্রয়ী মডেল তুলে ধরা হয়েছে। ‘ওয়ান ডলার স্ক্রিনিং’ নামক এই পদ্ধতিতে জনপ্রতি মাত্র ১ ডলার বা তার সমপরিমাণ ব্যয়ে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগ শনাক্ত করা সম্ভব।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অল্টারনেটিভ অ্যাপ্রোচ’ ও অস্ট্রেলিয়ার ‘সেবা’র যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণায় গবেষক দলে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞগণ। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, আক্রান্তদের মধ্যে লক্ষণ না থাকায় তারা আগে কখনো পরীক্ষা করাননি। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ এবং স্থূলতাকে এই রোগ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আশার আলো ও নীতিনির্ধারকদের করণীয়
গবেষণায় একটি চমকপ্রদ তথ্য পাওয়া গেছে। উপমহাদেশীয় গড় অনুযায়ী কিডনি রোগের হার ১৭% থেকে ২৪% হলেও, এই দুই উপজেলায় তা মাত্র ৩.৭%। নেপালের পূর্বাঞ্চলী জেলাগুলোতেও এমন নিম্ন হার দেখা গেছে। ভৌগোলিক বা জীবনধারার কোনো বিশেষত্বের কারণে এমনটি হচ্ছে কি না, তা জানতে আরও বড় পরিসরে গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডাঃ আহমেদ শরীফ জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় যদি এই স্বল্পব্যয়ী স্ক্রিনিং মডেলটি অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এটি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের চিকিৎসার খরচ বাঁচাবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের ওপর থেকেও চিকিৎসার বোঝা কমাবে। অসংক্রামক এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে গ্রামীণ জনপদকে রক্ষা করতে এখনই সমাজভিত্তিক স্ক্রিনিং ও সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।