Home Third Lead স্মৃতির ক্যানভাসে: ১৯৮২-র সেই হিমশীতল রাত ও প্রথম কিডনি সংযোজন

স্মৃতির ক্যানভাসে: ১৯৮২-র সেই হিমশীতল রাত ও প্রথম কিডনি সংযোজন

জীবনের রিপোর্টার

কামরুল ইসলাম

১০ ফেব্রুয়ারি , ১৯৮২ সাল। আনুষ্ঠানিক সাংবাদিকতা জীবনের বয়স তখনো দুইমাস পূর্ণ হয়নি। তরুণ রক্তে যে উত্তেজনা আর অজানাকে জানার ক্ষুধা থাকে, তার সবটুকুই তখন আমার পেশাগত নেশা। বংশালের ‘দৈনিক সংবাদ’ অফিসে কাজ শেষ করে কেবল হাতঘড়িতে সময় দেখছি, বাসায় ফেরার প্রস্তুতি। ঠিক তখনই ডাক পড়লো চিফ রিপোর্টার চপল বাশারের (শফিকুল বাশার চপল)।
গলায় তাঁর প্রচণ্ড তাড়া আর উত্তেজনা, “এই মুহূর্তে পিজিতে যেতে হবে। দেশের প্রথম সফল কিডনি সংযোজন হয়েছে। সেখান থেকে ফোন এসেছে। এটি আমাদের চিকিৎসা খাতের এক বিরাট ঘটনা!”
বাইরে তখন মাঘের শেষ বা ফাল্গুনের শুরুর হাড়কাঁপানো শীত। কুয়াশার চাদরে ঢাকা তিলোত্তমা শহর। সঙ্গী হলেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী লুৎফুর রহমান বীনু। তিনি তাঁর পুরনো মোটরবাইকটি স্টার্ট দিলেন। আমি পেছনে বসে যখন শাহবাগের দিকে ছুটছি, শীতে আমার জমে যাওয়ার অবস্থা। বীনু ভাই দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “শক্ত করে ধরো, শীতে কাঁপলে কিন্তু বাইক কন্ট্রোল করা মুশকিল!”
কুয়াশা চিরে যখন আমরা শাহবাগে পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বিএসএমএমইউ) পৌঁছালাম, তখন আমাদের হাত-পা আক্ষরিক অর্থেই অবশ।
অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমান। ছবি: সংগৃহীত
ভেতরে গিয়ে দেখা হলো নেফ্রোলজি বিভাগের প্রাণপুরুষ অধ্যাপক ডা. মতিউর রহমানের সঙ্গে। রাত অনেক হয়েছে, কিন্তু পিজির ওই কর্নারে তখন রাজ্যের ব্যস্ততা। প্রফেসর রহমান আমাকে সংক্ষেপে ব্রিফ করলেন প্রায় ৩২ বছর বয়সী সেই পুরুষ রোগীর সফল অস্ত্রোপচারের বিস্তারিত। বীনু ভাই দ্রুত কিছু ছবি তুলে নিলেন। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত বারোটা ছুঁইছুঁই। অফিসে সবার অধীর অপেক্ষা আমাদের জন্য, কারণ এই খবরটিই হবে পরদিনের প্রধান সংবাদ বা ‘ব্যানার লিড’।
বংশাল ফেরার পথে সেই একই হিমশীতল বাতাস, কিন্তু মনের ভেতর তখন ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার এক দারুণ উষ্ণতা। অফিসে ফিরে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বসলাম বলপেন আর নিউজপ্রিন্ট নিয়ে। তখন তো কম্পিউটার বা টাইপরাইটার ছিল না, নিউজপ্রিন্টে কলমের আঁচড়ই ছিল শেষ কথা।
আমি খসখস করে লিখে চলেছি, আর চপল ভাই আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে প্রতিটা লাইন খুঁটিয়ে পড়ছেন। প্রেসের তাড়া ছিল প্রচণ্ড, দেরি হলে পত্রিকা বিলিতে ব্যাঘাত ঘটবে। দ্রুততম সময়ে রিপোর্ট শেষ হলো। বীনু ভাইও ডার্করুম থেকে ছবি ওয়াশ করে হাজির হলেন।
পরদিন সকালে পত্রিকার পাতায় নিজের বাইলাইনে প্রধান সংবাদটি দেখে যে আনন্দ আর উদ্দীপনা কাজ করেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগদানের পর দুই মাস পার হওয়ার আগেই এমন এক ‘স্কুপ’! যদিও দেখলাম আরও দুটি পত্রিকা খবরটি পেয়েছে, তবে আমাদের প্রতিবেদনটি ছিল অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও তথ্যবহুল। সহকর্মীরা সেদিন প্রাণঢালা অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি আজও অম্লান।
কিন্তু গল্পের শেষটা ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত বিষাদের।
অস্ত্রোপচারের প্রায় দেড় মাস পরের কথা। একদিন দুপুরে হঠাৎ করেই সেই রোগীটির কথা মনে পড়লো। কোনো এক অদ্ভুত টানে খোঁজ নিতে অধ্যাপক মতিউর রহমানের কাছে গেলাম। আমাকে দেখেই প্রফেসরের চেহারায় এক ধরনের বিষণ্ণতার ছায়া দেখতে পেলাম।
তিনি অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানালেন, “খুব চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আজ সকালেই সেই লোকটি মারা গেছেন।” সফল অস্ত্রোপচারের পর প্রায় ৩২ বছর বয়সী সেই মানুষটি দেড় মাসের মাথায় গুরুতর জটিলতায় বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে।
সাফল্যের খবরটি অনেকেই পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই মৃত্যুর খবরটি একমাত্র ‘সংবাদ’-এই ছাপা হয়েছিল। দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রথম সেই বিশাল সাফল্যের আনন্দ আর তার দেড় মাস পরের সেই বিষাদ—দুটোরই একমাত্র সাংবাদিক সাক্ষী হয়ে রইলো আমার সাংবাদিকতা জীবনের শুরুর সেই অবিস্মরণীয় দিনগুলো।