Home কলকাতা চট্টগ্রাম ও কলকাতা: দুই শহরের ঐতিহাসিক বন্ধন

চট্টগ্রাম ও কলকাতা: দুই শহরের ঐতিহাসিক বন্ধন

 ব্রিটিশবিরোধী অগ্নিগর্ভ সংগ্রামের ইতিহাস

  • ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম ও কলকাতার বিপ্লবীদের মধ্যে ছিল নিবিড় সমন্বয় ও রণকৌশলগত ঐক্য।
  • মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ঘটনায় কলকাতার ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী সমাজ ছিল প্রধান অনুপ্রেরণা।
  • কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং বিভিন্ন বিপ্লবী আস্তানা ছিল চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয় ও পরিকল্পনার কেন্দ্র।
  • বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানে গঙ্গা ও কর্ণফুলী নদীর তীরের এই দুই শহর অবিচ্ছেদ্য ছিল।
কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: কলকাতা এবং চট্টগ্রাম—ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে এই দুই শহর একই সূত্রে গাঁথা। বিশেষ করে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে এই দুই শহরের মেলবন্ধন ছিল অনন্য। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের যে উত্তাল ঢেউ উঠেছিল, তার প্রধান দুটি কেন্দ্র ছিল কলকাতা ও চট্টগ্রাম।
কলকাতার তাত্ত্বিক বিপ্লব আর চট্টগ্রামের সশস্ত্র বিদ্রোহ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল সেই অগ্নিযুগে।
অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায়, চট্টগ্রামের যুববিদ্রোহ বা ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের প্রেক্ষাপট তৈরিতে কলকাতার বড় ভূমিকা ছিল। মাস্টারদা সূর্য সেন নিজে কলকাতায় পড়াশোনা করার সময় এখানকার বিপ্লবী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। কলকাতার ‘যুগান্তর’ এবং ‘অনুশীলন’ সমিতির কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা কলকাতায় এসে গোপন বৈঠক করতেন এবং বিস্ফোরক তৈরির কৌশল শিখতেন। আবার চট্টগ্রামের বীরত্বের কাহিনী কলকাতার সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়ে গোটা বাংলায় দেশপ্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দিত।
আন্দোলনের ইতিহাসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্তের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁরা কলকাতার বেথুন কলেজ এবং আশুতোষ কলেজে পড়ার সময় থেকেই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। চট্টগ্রামের জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের রেশ কলকাতায় ছড়িয়ে পড়লে এখানকার ছাত্রসমাজ রাজপথে নেমে এসেছিল।
চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের বিচার চলাকালীন কলকাতার বিশিষ্ট আইনজীবীরা তাঁদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়েছেন, যা দুই শহরের ভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও এই বন্ধন ছিল সুদৃঢ়। এক সময় চট্টগ্রামের বিখ্যাত ব্যবসায়ীরা কলকাতার বড়বাজারে গদি স্থাপন করেছিলেন, আবার কলকাতার বাবুরা চট্টগ্রামের চা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে বিনিয়োগ করতেন। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা ও লোকজ সংস্কৃতি কলকাতার সাহিত্যিকদের লেখায় বারবার উঠে এসেছে। দেশভাগের ফলে সীমানা টেনে দিলেও দুই শহরের মানুষের নাড়ির টান আজও অটুট রয়েছে।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস স্মরণ করা জরুরি। কারণ, চট্টগ্রামের লড়াকু মানসিকতা আর কলকাতার বৌদ্ধিক চেতনা মিলে যে আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল, তা-ই শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ রাজত্বের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহাসিক বন্ধন এবং আন্দোলনের শিক্ষা আজও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।