Home অন্যান্য জীবনের রিপোর্টার: অকৃতজ্ঞতার এক অনন্য দহন

জীবনের রিপোর্টার: অকৃতজ্ঞতার এক অনন্য দহন

পেশাগত জীবনের এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা

  • সামরিক শাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে একজন অসহায় সরকারি কর্মকর্তার পাশে দাঁড়ানোর সাহসী গল্প।
  • তৎকালীন সংবাদ পাঠানোর সীমাবদ্ধতা এবং সংবাদপত্র জগতের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ।
  • দীর্ঘ সময় পর উপকারভোগীর নেতিবাচক আচরণ এবং সাংবাদিকতার নৈতিক দর্শনের প্রতিফলন।
  • চার দশকের পেশাগত জীবনে অসংখ্য অকৃত্রিম সম্পর্কের বিপরীতে এক বিরল ও বিচিত্র চরিত্রের বিশ্লেষণ।
কামরুল ইসলাম: পেশাদার সাংবাদিকতা বা রিপোর্টিং কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষের জীবনের গভীরে প্রবেশ করার এক অনন্য সুযোগ। গত চার দশকে কত সহস্র মানুষের প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছি, তার কোনো হিসেব রাখিনি। কারো প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে, কারো হয়নি; কিন্তু চেষ্টাটা সবসময়ই ছিল অকৃত্রিম। কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়, বরং কারো সংকটে ঢাল হয়ে দাঁড়াতে পারার মাঝেই খুঁজে পেয়েছি প্রকৃত তৃপ্তি।
অনেকেই সেসব স্মৃতি হৃদয়ে গেঁথে রেখেছেন, কেউ কেউ হয়তো সময়ের স্রোতে বেমালুম ভুলে গেছেন। তবে আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এমন একজনের দেখা পেয়েছিলাম, যার আচরণ আমাকে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে।
ঘটনাটি তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল এরশাদের আমলের। আমি তখন দৈনিক সংবাদ-এর তরুণ স্টাফ রিপোর্টার। পেশার প্রতি তীব্র টান আরুণ্যদীপ্ত সাহসই ছিল একমাত্র মূলধন। একদিন আমার এক অগ্রজ সাংবাদিকের অফিসে বসে আছি, এমন সময় এক ভদ্রলোক এলেন। তার চোখেমুখে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম তীব্র ক্ষোভ এবং অজানা এক ভয়ভীতির ছাপ।
তিনি সবেমাত্র সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়িতে। সেখানে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত করা হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে তার পরিবার প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল, সেই পরিচয়ে তিনি চট্টগ্রামের নামজাদা কয়েকটি সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু সামরিক শাসনের সেই প্রতিকূল সময়ে কেউই তার এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন ছাপানোর ঝুঁকি নিতে চাননি।
অন্যদের কাছে যা ছিল ‘উটকো ঝামেলা’, আমার কাছে তা মনে হয়েছিল একজন মানুষের আর্তনাদ। পেশাগত বয়স তখন খুব বেশি না, মাত্র শিক্ষানবিসকাল পার করেছি। পরিণতির কথা অতটা না ভেবেই আমি তার সেই মানবিক বিপর্যয়ের কাহিনীটি তুলে ধরতে আগ্রহী হলাম। সে আমলে আজকের মতো তথ্যপ্রযুক্তির দাপট ছিল না। ল্যান্ডফোন আর তারবার্তার মাধ্যমে সংবাদ পাঠানো হতো। আমি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে প্রতিবেদনটি তৈরি করে টেলিফোনে অফিসে পাঠালাম। পরদিন দৈনিক সংবাদের পিছনের পাতায় এক কলামে খবরটি গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হলো।
তখন রাজধানী থেকে চট্টগ্রামে সংবাদপত্র পৌঁছাত সড়কপথে বেলা একটার দিকে। কিন্তু সেই সংবাদের প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছিল সাতসকালেই ঢাকা থেকে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো এবং সেই কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক প্রতিকার পেলেন। হয়তো তার চোখেমুখে তখন এক স্বস্তির হাসি, কিন্তু দেখিনি। আমার সাথে দেখা হয়নি। ঘটনার সেখানেই ইতি হতে পারত, কিন্তু নিয়তি আমাদের আবার মুখোমুখি করেছিল অনেক বছর পর, জীবনের অন্য এক বাঁকে।
দীর্ঘদিন পর যখন তাকে আবার দেখলাম, আমি এক মুহূর্তেই চিনে ফেললাম। অনেক আগে তিনি সরকারি সেই চাকরি ইস্তফা দিয়ে পারিবারিক ব্যবসায়।  পুরনো সেই দুঃসময়ের কথা মনে করিয়ে দিতেই দেখলাম তিনি প্রচণ্ড অস্বস্তিতে ভুগছেন। মনের সব নক্ষত্র সজাগ থাকলেও তিনি যেন সেই স্মৃতি এড়িয়ে যেতে চাইছিলেন। আমার ভেতরে একটা সুপ্ত ধারণা ছিল, বিপদের দিনের সেই সহায়তার কথা ভেবে তিনি হয়তো সৌজন্য দেখাবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তার উল্টো চিত্র। কৃতজ্ঞতা তো দূরের কথা, তিনি বরং নানাভাবে আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন—যাকে বলে পদে পদে আমার ‘উপকার’ করলেন।
আমার এই দীর্ঘ পেশাগত জীবনে এমন চরিত্রের সন্ধান আমি দ্বিতীয়টি পাইনি। অথচ এই পেশার সূত্র ধরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য অকৃত্রিম পারিবারিক সম্পর্ক, যা আজও অটুট। কিন্তু ওই একজন মানুষ আমাকে জীবনের এক কঠিন পাঠ শিখিয়ে গেছেন—মানুষ কখনো কখনো তার সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তের সাক্ষী বা সাহায্যকারীকে নিজের বর্তমান অবস্থানের জন্য ‘অস্বস্তিকর’ মনে করতে শুরু করে। জীবনের রিপোর্টিং খাতায় এটি এক অমীমাংসিত অধ্যায় হয়েই থাকবে।
businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মন্তব্য জানান।