ফরিদুল আলম, ঢাকা:
তামাকজাত পণ্যের ওপর কর বসিয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় করা—উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি পরিচিত অর্থনৈতিক কৌশল। কিন্তু এই আয়ের আড়ালে যে বিপুল পরিমাণ স্বাস্থ্যগত ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক ক্ষতি লুকিয়ে থাকে, তা অনেক সময়ই আড়ালে পড়ে যায়। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ভারতে এই খাতের যে বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
ভারতের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য খাতের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তামাকের রাজস্ব আয়ের ফাঁদে কীভাবে আটকে আছে রাষ্ট্র।
রাজস্ব আয়ের মায়া বনাম ব্যয়ের মহাসংকট
ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে সিগারেট, বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা, গুল) থেকে সরকার বছরে প্রায় ৭৫,০০০ কোটি রুপি রাজস্ব আয় করে। আপাতদৃষ্টিতে এই অঙ্ক বিশাল মনে হলেও, এর বিপরীতে যে ক্ষতি হচ্ছে তা চোখ কপালে তোলার মতো।
তামাক সেবনের ফলে সৃষ্ট ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অকাল মৃত্যুর কারণে ভারতের অর্থনীতিতে বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১,৭৭,৩৪০ কোটি রুপি। অর্থাৎ, সরকার তামাক খাত থেকে প্রতি ১০০ রুপি আয় করতে গিয়ে দেশের স্বাস্থ্য ও উৎপাদনশীলতা খাত থেকে হারিয়ে ফেলছে প্রায় ৮১৬ রুপি। তামাকের এই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতি ভারতের মোট জিডিপির (GDP) প্রায় ১.০৪ শতাংশ গ্রাস করে নিচ্ছে।
একই সুতোয় গাঁথা: বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
ভারতের এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক সমীকরণ কেবল তাদের নিজস্ব সমস্যা নয়। বাংলাদেশসহ প্রায় সব উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশের চিত্র কমবেশি একই রকম।
রাজস্বের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা: ভারতের মতোই বাংলাদেশেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) কর আয়ের একটি বড় অংশ আসে সিগারেট ও তামাকজাত পণ্য থেকে। ফলে অর্থনৈতিক পলিসি তৈরির সময় তামাক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা এর ওপর সর্বোচ্চ কর আরোপের সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে বাজেট ঘাটতির আশঙ্কায় পিছপা হতে হয় নীতিনির্ধারকদের।
চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা: বাংলাদেশেও বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক খাত থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পেছনে রাষ্ট্র এবং জনগণের সম্মিলিত ব্যয়ের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।
বিড়ি ও কম দামি সিগারেটের ফাঁদ: ভারতে মোট তামাক ব্যবহারকারীর একটি বিশাল অংশ বিড়ি ও জর্দা ব্যবহার করলেও করের সিংহভাগ (৮৫%) আসে সিগারেট থেকে। ঠিক একইভাবে, বাংলাদেশেও কম দামি সিগারেট এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকের (জর্দা-গুল) ওপর করের হার তুলনামূলক কম, যা মূলত দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।
নিষেধাজ্ঞার পথে আসল অন্তরায় কোথায়?
প্রশ্ন জাগতে পারে, ক্ষতির পরিমাণ যেখানে আট গুণ বেশি, সেখানে তামাক পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না কেন? এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
চাষি ও শ্রমিকের কর্মসংস্থান: ভারতে বিড়ি শিল্প এবং তামাক চাষের সাথে কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা জড়িত। বাংলাদেশেও কুষ্টিয়া, রংপুর বা বান্দরবানের মতো এলাকায় তামাক প্রধান অর্থকরী ফসল। বিকল্প চাষাবাদ বা পুনর্বাসনের কার্যকর রোডম্যাপ ছাড়া রাতারাতি নিষেধাজ্ঞা সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
নীতি নির্ধারণে তামাক কোম্পানির প্রভাব: বহুজাতিক তামাক কোম্পানিগুলো সরকারের রাজস্বে বড় অবদান রাখার দোহাই দিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে শক্তিশালী লবিং বজায় রাখে, যা কঠোর তামাকবিরোধী আইন বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়।
ভারতের এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, তামাককে ‘লাভজনক রাজস্বের উৎস’ মনে করা একটি অর্থনৈতিক বিভ্রম মাত্র। তামাকের পেছনে যে টাকা চিকিৎসা খাতে ব্যয় হচ্ছে এবং কর্মক্ষম যুবসমাজ অকালে প্রাণ হারাচ্ছে, তা যেকোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশকেও এই রাজস্বের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসে তামাকমুক্ত দেশ গঠনে কঠোর কর নীতি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে নজর দিতে হবে।










