তারিক-উল-ইসলাম, ঢাকা: বাংলাদেশে তামাক কেবল একটি ব্যক্তিগত অভ্যাস নয়, বরং এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (PPRC)-এর সাম্প্রতিক (২০২৪-২৫) তথ্যমতে, তামাক ব্যবহারের ফলে দেশে বছরে প্রায় ২ লক্ষ মানুষ অকালে প্রাণ হারাচ্ছেন। বর্তমানের এই নীরব মহামারি দেশের জনস্বাস্থ্যকে এক গভীর খাদের কিনারে ঠেলে দিচ্ছে।
১. গবেষণার প্রেক্ষাপট ও ভয়াবহ পরিসংখ্যান
বাংলাদেশে তামাকের প্রভাব নিয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো এসেছে তিনটি প্রধান উৎস থেকে:
- জাতীয় পর্যায়ে: ২০১৮-১৯ সালে বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত গবেষণা এবং ২০২৪-২৫ সালে প্রকাশিত PPRC-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন।
- আন্তর্জাতিক পর্যায়ে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (CDC)-এর কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (GATS)।
এই গবেষণাসমূহ প্রমাণ করে যে, দেশের ১৫ বছর তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩৫.৩ শতাংশ (প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ মানুষ) তামাক ব্যবহার করেন। এর মধ্যে ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা, গুল) ব্যবহারের হার নারীদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বেশি।
২. মৃত্যুর মিছিল ও তামাকজনিত রোগ
তামাক কেবল ফুসফুসের ক্ষতি করে না, এটি শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে আক্রান্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে:
হৃদরোগ ও স্ট্রোক: বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ তামাক। ধূমপায়ীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় দ্বিগুণ।
ক্যান্সার: দেশের মোট ক্যান্সার রোগীর একটি বিশাল অংশ তামাকের কারণে আক্রান্ত, যার মধ্যে ফুসফুস, মুখগহ্বর এবং খাদ্যনালীর ক্যান্সার প্রধান।
শ্বাসকষ্ট ও সিওপিডি: দীর্ঘমেয়াদী তামাক সেবনে ফুসফুস তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, যার কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই।
৩. পরোক্ষ ধূমপান: নীরব ঘাতক
আন্তর্জাতিক তামাক নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর (যেমন: Tobacco Atlas) মতে, পরোক্ষ ধূমপানের কারণে বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে:
গণপরিবহন এবং জনসমাগমস্থলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মানুষ বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসছে।
গর্ভবতী নারী ও শিশুরা এর প্রধান শিকার, যার ফলে প্রজনন স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও শিশুদের হাঁপানি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ছে।
৪. তরুণ প্রজন্ম ও ই-সিগারেটের নতুন রূপ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কবার্তা অনুযায়ী, তামাক কোম্পানিগুলো এখন তরুণদের টার্গেট করে ই-সিগারেট বা ভ্যাপিংয়ের মতো ক্ষতিকর পণ্য বাজারজাত করছে। বাহারি ফ্লেভার ও আধুনিক গ্যাজেটের মোড়কে এগুলো কিশোরদের তামাকের দিকে ধাবিত করছে, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
“গবেষণায় দেখা গেছে, তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার গড় বয়স ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। এটি কেবল স্বাস্থ্য সংকট নয়, বরং দেশের তরুণ শ্রমশক্তিকে অকালে পঙ্গু করে দিচ্ছে।”










