Home জাতীয় ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার সংস্কৃতি ভাঙার সাহসী অঙ্গীকার

ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার সংস্কৃতি ভাঙার সাহসী অঙ্গীকার

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন, ধর্ম বিষয়ক উপদেষ্টা

বিশেষ সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূখণ্ডে ‘ক্ষমতা’ মানেই যেখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এক রূঢ় প্রতিযোগিতা, সেখানে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সাম্প্রতিক মন্তব্যটি মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো স্বস্তি নিয়ে এসেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক মতবিনিময় সভায় তিনি যখন বলেন, “যেদিন দায়িত্ব নিয়েছি সেদিন থেকেই বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি,” তখন তা কেবল একজন ব্যক্তির কণ্ঠস্বর থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে রাষ্ট্র সংস্কারের এক বলিষ্ঠ ইশতেহার।

আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি বরাবরই কণ্টকাকীর্ণ। গদি রক্ষার জন্য সংবিধানের ব্যবচ্ছেদ কিংবা ছলেবলে কৌশলে শাসনকাল দীর্ঘায়িত করার যে সংস্কৃতি গত কয়েক দশকে প্রোথিত হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের এই নির্মোহ অবস্থান তার মূলে কুঠারাঘাত করেছে।

উপদেষ্টাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট সমর্পণের তথ্যটি নিছক প্রশাসনিক কোনো কাজ নয়; এটি নৈতিকতার সেই উচ্চমার্গ, যা প্রমাণ করে—তাঁরা এসেছেন ‘শাসক’ হতে নয়, বরং ‘সেবক’ ও ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে একটি ধ্বংসপ্রায় ব্যবস্থাকে মেরামত করতে।

১২ ফেব্রুয়ারির আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে উপদেষ্টার আশাবাদ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রের কবর রচনা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন, তা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনারই প্রতিফলন। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে সম্মানের সাথে ঘরে ফেরার এই মানসিকতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকদের জন্য এক অনন্য শিক্ষণীয় অধ্যায়।

বিশেষ করে, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মীয় প্রতিনিধিদের মিলনমেলায় দাঁড়িয়ে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চিত্রকে আরও উজ্জ্বল করেছে। যেখানে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ক্ষমতার মোহ ত্যাগের ঘোষণা আসে, সেখানে জনগণের ক্ষমতায়ন ত্বরান্বিত হওয়া অনিবার্য।

আমরা মনে করি, ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার চিরাচরিত ‘দুঃখজনক প্রবণতা’ থেকে বেরিয়ে আসার এই সৎ সাহসই পারে একটি মানবিক ও সুশৃঙ্খল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। ধর্ম উপদেষ্টার এই সময়োপযোগী ও সাহসী অবস্থানকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

ক্ষমতার পালাবদল যখন অনিশ্চয়তা নয় বরং স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসে, তখনই বোঝা যায় রাষ্ট্র সঠিক পথেই এগোচ্ছে। বিদায়ের এই প্রস্তুতিই হোক আগামীর সুন্দর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের আগাম অভ্যর্থনা।