বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। তবে বিশাল এই বিজয়ের মধ্যেও দলটির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের নির্বাচনী ফলাফল। এই তিন বিভাগে বিএনপির আশানুরূপ ফল করতে না পারার নেপথ্যে ভুল প্রার্থী মনোনয়ন এবং জামায়াতে ইসলামীর একক শক্তির উত্থানকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে জামায়াতের প্রভাব ও ত্রিমুখী লড়াই
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অনেকগুলো আসনে বিএনপি প্রার্থীদের বড় ব্যবধানে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা। বিশেষ করে রংপুর বিভাগের ৩৩টি আসনের মধ্যে বিএনপি মাত্র ১৫টি আসনে জয় পেয়েছে, যেখানে জামায়াত ও তাদের জোট জিতেছে ১৭টি আসনে। খুলনার সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলেও জামায়াত প্রার্থীরা অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের লড়াই মূলত বিএনপি বনাম জামায়াতে রূপ নেয়, যেখানে তৃণমূলের সুসংগঠিত ভোট ব্যাংক জামায়াতকে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে।
প্রার্থী মনোনয়নে অদূরদর্শিতা
নির্বাচনের আগে থেকেই গুঞ্জন ছিল যে, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে বিএনপির প্রার্থী বাছাই যথাযথ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ত্যাগী ও জনসম্পৃক্ত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত বা জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগ ছিল।
রাজশাহী অঞ্চল: এখানে হেভিওয়েট কিছু প্রার্থী জয়ী হলেও অনেক আসনে নতুন ও তুলনামূলক কম পরিচিত প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অনীহা দেখা গেছে।
খুলনা বিভাগ: এই বিভাগে স্থানীয় কোন্দল মেটাতে ব্যর্থ হওয়ায় দলের একটি বড় অংশ নিষ্ক্রিয় ছিল, যা সরাসরি ভোটে প্রভাব ফেলেছে।
জুলাই বিপ্লবের ‘প্রজন্ম’ ও এনসিপি ফ্যাক্টর
জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের (Gen Z) ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরাঞ্চলের তরুণ ভোটাররা প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এনসিপি বা জামায়াতের নতুন ধারার প্রচারণায় বেশি আকৃষ্ট হয়েছে। বিএনপি অনেক ক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের এই আকাঙ্ক্ষা বুঝতে এবং সেই অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছে।
স্থানীয় কোন্দল ও সমন্বয়হীনতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, খুলনা ও রাজশাহী বিভাগে বিএনপির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব হয়নি। অনেক আসনে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোট ভাগ হয়ে গেছে, যার সুফল নিয়েছে প্রতিপক্ষ প্রার্থীরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “বিএনপি সারাদেশে গণজোয়ার তৈরি করতে পারলেও কিছু নির্দিষ্ট পকেটে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ ও তৃণমূলের সাথে দূরত্বের কারণে হোঁচট খেয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের বিপরীতে দুর্বল প্রার্থী দেওয়া দলটির জন্য কৌশলগত ভুল ছিল।”
বিশাল বিজয়ের আনন্দ থাকলেও রাজশাহী, রংপুর ও খুলনার এই ‘ক্ষত’ আগামী দিনে বিএনপির সংসদীয় রাজনীতি ও সাংগঠনিক পুনর্গঠনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।
আরও আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাদের জানান।