বিশ্বাসের এক পাহারাদার, ১৬ বছরের অবিচ্ছেদ্য আখ্যান
শামসুল ইসলাম
রাজনীতির মঞ্চে উত্থান-পতন থাকে, থাকে ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে কিছু মানবিক সম্পর্ক তৈরি হয় যা ইতিহাসকেও হার মানায়। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাঁর ছায়াসঙ্গী ফাতেমা বেগমের সম্পর্কটি ঠিক তেমনই এক বিরল উপাখ্যান।
এটি কেবল একজন নেত্রী ও তাঁর গৃহকর্মীর গল্প নয়; এটি সীমাহীন আনুগত্য, ত্যাগ এবং শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত পাশে থাকার এক জীবন্ত দলিল।
ফাতেমা বেগমের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৯ সালে। ভোলার এই নারী তখন ব্যক্তিগত জীবনে দিশেহারা—স্বামী হারুন লাহাড়িকে হারিয়ে দুই সন্তান নিয়ে জীবনযুদ্ধের মুখোমুখি। এক পরিচিতের মাধ্যমে তিনি ঠাঁই পান গুলশানের ‘ফিরোজা’য়।
সাধারণ গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করলেও ফাতেমার মায়া ও সেবা খুব দ্রুতই খালেদা জিয়ার মনে গভীর দাগ কাটে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়ার দিনরাত্রির প্রধান নির্ভরতা।
২০১৪: যখন ছায়া হলেন প্রকাশ্য
জনসমক্ষে ফাতেমা প্রথম নজরে আসেন ২০১৪ সালে। ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচির উত্তাল সময়ে পুলিশের বাধা আর ব্যক্তিগত ক্লান্তিতে খালেদা জিয়া যখন প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন, তখন এক জোড়া শক্ত হাত তাঁকে আগলে রেখেছিল। সেই হাত দুটি ছিল ফাতেমার। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী সেই দৃশ্যটি মানুষকে জানিয়ে দিয়েছিল, ‘ম্যাডাম’ আর একা নন; তাঁর পাশে ছায়ার মতো এক পাহারাদার রয়েছে।
কারাগার: যেখানে বিশ্বস্ততার পরীক্ষা
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। খালেদা জিয়ার জীবনে নেমে আসে কারাবাসের কালো অধ্যায়। রাজনীতির কত রথী-মহারথী তখন বাইরে, কিন্তু ফাতেমা নিয়েছিলেন এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত। তিনি স্বেচ্ছায় কারাবরণের আবেদন করেন যাতে তাঁর প্রিয় নেত্রীর সেবা করতে পারেন। আদালতের অনুমতি নিয়ে তিনি নাজিমুদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগার থেকে শুরু করে পিজি হাসপাতাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ মাস খালেদা জিয়ার সঙ্গ ছাড়েননি। বন্দিশালার সেই নিস্তব্ধ প্রহরে ফাতেমাই ছিলেন খালেদা জিয়ার একমাত্র স্বজন, একমাত্র আলাপচারী।
‘সবার আগে আমি ফাতেমাকেই চাই’
অসুস্থতা আর বার্ধক্যের দিনগুলোতে খালেদা জিয়ার পৃথিবীটা যখন ঘরবন্দী হয়ে পড়েছিল, তখন ফাতেমা ছিলেন তাঁর চোখ ও কান। বাথরুমে যাওয়া থেকে শুরু করে সময়মতো ওষুধ খাওয়ানো—সবই ফাতেমা নিজ হাতে করতেন।
খালেদা জিয়া একবার অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে বলেছিলেন, “সবার আগে আমি ফাতেমাকেই চাই।” এই একটি বাক্যই বলে দেয় ফাতেমা তাঁর জীবনে কতটা অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন।
শেষ বিদায়ের সাক্ষী:
২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর। ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে যখন এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটছিল, তখনও সেই পরিচিত দৃশ্যটি বদলায়নি। খালেদা জিয়ার শয্যাপাশে অশ্রুসজল চোখে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই একই মানুষ—ফাতেমা বেগম। ১৬ বছর আগে যে সেবার ব্রত নিয়ে তিনি ফিরোজায় পা রেখেছিলেন, নেত্রীর শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।
ফাতেমা বেগম কোনো রাজনীতিক নন, কোনো পদ-পদবিও তাঁর নেই। কিন্তু তিনি যা দেখিয়েছেন, তা রাজনীতির দলিলে বিরল। স্বার্থপরতার এই যুগে ফাতেমা প্রমাণ করেছেন যে, বিশ্বাস আর ভালোবাসা থাকলে মানুষ কীভাবে অন্য একজনের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ ও কন্টকাকীর্ণ পথে ফাতেমা কেবল একজন ‘গৃহকর্মী’ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আনুগত্যের এক অনুপম ভাস্কর্য।
ফাতেমা বেগম, বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের চতলা গ্রামে।