Home First Lead বিষাক্ত বাতাসে বিপন্ন ঢাকা

বিষাক্ত বাতাসে বিপন্ন ঢাকা

 সংবাদ বিশ্লেষণ 

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: পরিবেশগত নানা ঝুঁকি বর্তমানে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেবল বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি এবং দুর্বল স্যানিটেশনের কারণে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮০ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। এই নীরব ঘাতকদের কারণে জনস্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হচ্ছে, তা যেকোনো বড় মহামারির চেয়েও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বৈশ্বিক চিত্র: এক নজরে মৃত্যুর পরিসংখ্যান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পরিবেশগত দূষণের শিকার হয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন:
বায়ুদূষণের থাবা: বিশ্বব্যাপী শুধু বায়ুদূষণের কারণে বছরে প্রায় ৬৬ লাখ মানুষের অকাল মৃত্যু হচ্ছে। ঘরের ভেতরের বিষাক্ত ধোঁয়া এবং বাইরের বাতাসে ভাসমান ক্ষতিকর ধূলিকণা (PM2.5) ফুসফুসের ক্যানসার, স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং মারাত্মক শ্বাসকষ্টের জন্য দায়ী।
অনিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন: নিরাপদ পানির অভাব এবং দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে বিশ্বজুড়ে বছরে আরও প্রায় ১৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড ও জন্ডিসের মতো পানিবাহিত রোগ মহামারি আকার ধারণ করছে, যার বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা।
বিশেষ ফোকাস: ঢাকার বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্য বিপর্যয়
বৈশ্বিক এই সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ার (IQAir)-এর লাইভ ডাটা এবং বৈশ্বিক সূচকে ঢাকা প্রায়শই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষ তিনের মধ্যে অবস্থান করে।
ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, নির্মাণকাজ, ইটভাটার কালো ধোঁয়া এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের বিষাক্ত গ্যাস। শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ুমান সূচক (AQI) অনেক সময় ৩০০ থেকে ৪০০-এর ঘর পার হয়ে যায়, যা মানবদেহের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচিত।
ঢাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকির ভয়াবহতা:
১. শ্বাসতন্ত্রের রোগ বৃদ্ধি: ঢাকার হাসপাতালগুলোর বহির্বিভাগে প্রতিদিন ফুসফুসের সংক্রমণ, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং অ্যাজমার রোগী আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুরা অল্প বয়সেই ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে।
২. গর্ভবতী নারী ও শিশুদের ক্ষতি: চিকিৎসকদের মতে, ঢাকার বাতাসে থাকা পিএম ২.৫ (PM2.5) কণা এতই সূক্ষ্ম যে তা সরাসরি রক্তে মিশে যায়। এর ফলে গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত বা সময়ের আগে কম ওজনের শিশু জন্মদানের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
৩. আয়ু কমে যাওয়া: শিকাগো ইউনিভার্সিটির এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউটের (EPIC) এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বায়ুদূষণের কারণে ঢাকার বাসিন্দাদের গড় আয়ু প্রায় ৫ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কমে যাচ্ছে।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এই স্বাস্থ্য বিপর্যয় রুখতে জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন:
কঠোর আইন ও প্রয়োগ: ঢাকার চারপাশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা এবং নির্মাণ সামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় পরিবহন ও রাখা নিষিদ্ধ করতে হবে।
সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার: জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে ঝুঁকতে হবে এবং কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন রাস্তা থেকে অপসারণ করতে হবে।
বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা: বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে শিল্পবর্জ্য মুক্ত করা এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য নিরাপদ সুপেয় পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ রক্ষা না করলে শুধু হাসপাতাল বা ওষুধের সরবরাহ বাড়িয়ে এই বিপুল পরিমাণ অকাল মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব নয়।

ভিজিট করুন www.businesstoday24.com