বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ) চট্টগ্রাম বন্দরে অনুমোদিত জাহাজের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছে। সংস্থাটি বন্দর কর্তৃপক্ষকে (সিপিএ) পাঠানো ১৯ আগস্টের এক চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
বিএসএএ জানায়, চলতি বছরের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গিয়ার্ড ও গিয়ারলেস উভয় ধরনের জাহাজের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের মতামতকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করা হয়নি। সংগঠনটির দাবি, তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে হঠাৎ জাহাজ কমানো দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে।
অ্যাসোসিয়েশনের মতে, গত কয়েক মাসে বন্দরে জাহাজের অবস্থানকাল বা বার্থিং ডিলে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং চলমান প্রক্রিয়াগুলো বাস্তবায়িত হলে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে। তাই জাহাজ সংখ্যা হ্রাসের কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করছে বিএসএএ।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএএ) বন্দরের ওই সিদ্ধান্তকে ‘একতরফা’ ও ‘আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি বাস্তবায়ন হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিপর্যয় নেমে আসবে। বন্দরের সক্ষমতা না বাড়িয়ে জাহাজের সংখ্যা কমানো হলে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার পরিবহন বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি জাহাজের আগমন বেড়ে যাওয়ায় বহির্নোঙরে অপেক্ষার সময় বাড়ছে, যা নিরসনে জাহাজের সংখ্যা সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জটের জন্য দায়ী কারা?
বিএসএএ তাদের চিঠিতে দাবি করেছে, জাহাজজটের মূল কারণ জাহাজের সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং বন্দরের বহু বছর ধরে চলে আসা কাঠামোগত সংকট ও অব্যবস্থাপনা। তাদের চিহ্নিত প্রধান সমস্যাগুলো হলো:
যন্ত্রপাতি সংকট: কন্টেইনার টার্মিনালগুলোর গ্যান্ট্রি ক্রেন প্রায়ই বিকল থাকছে, যার ফলে জাহাজ খালাসে ৩-৪ দিন পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে। গত মে মাসে ১৭টি নতুন স্ট্র্যাডল ক্যারিয়ার বন্দরে আসলেও সেগুলো আজও চালু করা হয়নি।
ট্রেইলার স্বল্পতা: কন্টেইনার পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত ট্রেইলার না থাকায় আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নীতিগত সীমাবদ্ধতা: রাতে জাহাজ চলাচলে (নাইট নেভিগেশন) সীমাবদ্ধতা এবং ১৯০ মিটারের বড় জাহাজ ভেড়ানোর ক্ষেত্রে জটিল শর্তারোপ বন্দরের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহারে বাধা সৃষ্টি করছে।
বাহ্যিক প্রভাব: গত কয়েকমাসে বিভিন্ন উৎসব উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটি, এনবিআর কর্মকর্তাদের ধর্মঘট এবং পরিবহন ধর্মঘটের মতো বিষয়গুলো বন্দরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিপর্যয়ের আশঙ্কা
বিএসএএ হুঁশিয়ারি দিয়েছে, জাহাজের সংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর মধ্যে রয়েছে:
- রপ্তানি বাণিজ্যে আঘাত: দেশের প্রধান রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পেরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
- খরচ বৃদ্ধি: জাহাজের সংখ্যা কমলে ভাড়া (Freight Cost) অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাবে এবং বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলো সারচার্জ আরোপ করতে পারে, যার ভার শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়বে।
- আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ: বিদেশি বন্দরগুলোর সাথে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের সূচি ভেঙে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে।
বিএসএএ’র প্রস্তাবনা
সংগঠনটি সমস্যা সমাধানে জাহাজের সংখ্যা না কমিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। তাদের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা।
২. অবিলম্বে নতুন স্ট্র্যাডল ক্যারিয়ারগুলো চালু এবং বিকল যন্ত্রপাতি মেরামত করা।
৩. পরীক্ষামূলকভাবে নাইট নেভিগেশন চালু করা।
৪. পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালকে (পিসিটি) পুরোদমে ব্যবহার করে মূল বন্দরের ওপর চাপ কমানো।
পরিসংখ্যান তুলে ধরে বিএসএএ জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজের সংখ্যা কর্তৃপক্ষের দাবির চেয়ে কম ছিল।
পরিসংখ্যানগত তথ্য
বিএসএএ তাদের যুক্তির সপক্ষে ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে, যেখানে দেখা যায় বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া জাহাজের সংখ্যা নিম্নরূপ:
| মাস | ছেড়ে যাওয়া জাহাজের সংখ্যা |
| জানুয়ারি | ১২৫ |
| ফেব্রুয়ারি | ১০৭ |
| মার্চ | ১১০ |
| এপ্রিল | ১১৩ |
| মে | ১১৬ |
| জুন | ১০৮ |
এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে বিএসএএ যুক্তি দিয়েছে যে, জাহাজের সংখ্যা কর্তৃপক্ষের দাবিমতো ১১৮-এর চেয়ে কম ছিল।
এ পরিস্থিতিতে বন্দর কর্তৃপক্ষ বিএসএএ-এর চিঠি এবং প্রস্তাবনাগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপরই দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।










