কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: বিশ্ব পোশাক বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান ধরে রাখার লড়াইয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভিয়েতনাম। একদিকে ভিয়েতনামের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আইনি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে ২০২৬ সাল বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য একটি ‘অগ্নিপরীক্ষার’ বছর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১. ভিয়েতনাম কেন বড় প্রতিযোগী?
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভিয়েতনাম বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে:
শ্রমিক দক্ষতা: ভিয়েতনামের একজন শ্রমিক ঘণ্টায় গড়ে ৩২০ পিস পোশাক উৎপাদন করেন, যেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকের গড় উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ পিস। অর্থাৎ ভিয়েতনামের উৎপাদনশীলতা প্রায় ৩৯% বেশি।
লিড টাইম (Lead Time): উন্নত বন্দর অবকাঠামো থাকায় ভিয়েতনাম পণ্য জাহাজীকরণে বাংলাদেশের চেয়ে ১৫-২০ দিন কম সময় নেয়। বাংলাদেশ এখনও গভীর সমুদ্রবন্দরের অভাবে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর ওপর নির্ভরশীল।
উচ্চমূল্যের পণ্য (High-value Items): ভিয়েতনাম এখন সাধারণ টি-শার্ট ছেড়ে জ্যাকেট, স্পোর্টসওয়্যার এবং কৃত্রিম তন্তুর (Man-made fiber) পোশাক তৈরিতে বিশ্বসেরা হচ্ছে, যেখানে বাংলাদেশের অধিকাংশ কারখানা এখনও সুতির (Cotton) ওপর নির্ভরশীল।
২. বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা যে ধরণের সংকটে পড়বেন:
ক) শুল্ক সুবিধা হারানো ও দামের প্রতিযোগিতা: ২০২৬ সালে এলডিসি উত্তরণের ফলে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের ওপর ১২% শুল্ক আরোপের ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, ভিয়েতনামের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (EVFTA) থাকায় তারা শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে। এর ফলে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে ভিয়েতনামের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
খ) উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি: দেশে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি এবং উচ্চ ব্যাংক সুদের হারের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এর ফলে রপ্তানিকারকরা ভিয়েতনামের সাথে ‘প্রাইস ওয়ার’ বা দামের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ছেন।
গ) ইমেজ সংকট ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: সাম্প্রতিক সময়ে সুতার ওপর শুল্ক আরোপ নিয়ে স্থানীয় স্পিনার ও পোশাক মালিকদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে। গত ৫ মাসে বিশ্বের অন্তত ২৬টি দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি কিছুটা কমেছে, যা সংকটের অশনিসংকেত।
ঘ) ম্যান-মেড ফাইবারে অনীহা: বিশ্বের মোট পোশাক চাহিদার প্রায় ৭০% এখন কৃত্রিম তন্তুর (Synthetic), কিন্তু বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০%-ই এখনও সুতির। ভিয়েতনাম এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দ্রুত বাজার দখল করছে।
৩. উত্তরণের উপায়:
শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, সংকটে না পড়ে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত তিনটি পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানো: বন্দরের কাজ দ্রুত শেষ করে লিড টাইম কমিয়ে আনা।
২. পণ্য বহুমুখীকরণ: দ্রুত ম্যান-মেড ফাইবার এবং হাই-ভ্যালু পোশাকে বিনিয়োগ করা।
৩. কূটনৈতিক তৎপরতা: ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করা।
ভিয়েতনাম এখন আর কেবল সস্তা শ্রমের দেশ নয়, বরং তারা একটি উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমশক্তির কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের এখন ‘পরিমাণ’ (Quantity) নয় বরং ‘গুণগত মান’ (Quality) ও ‘দক্ষতা’ (Efficiency)-র দিকে নজর দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
এ ধরণের আরও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট পেতে ভিজিট করুন www.businesstoday24.com










