Home Second Lead হংকং কনভেনশন: নিরাপত্তা নাকি মালিকদের ঢাল?

হংকং কনভেনশন: নিরাপত্তা নাকি মালিকদের ঢাল?

পর্ব ২:

সিরিজ প্রতিবেদন: মৃত্যুর সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম: জাহাজ ভাঙা শিল্পকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করতে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (IMO) ‘হংকং কনভেনশন (HKC)’ প্রবর্তন করেছিল, যা ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে কার্যকর হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। এই কনভেনশন কি সত্যিই শ্রমিকের নিরাপত্তা দিচ্ছে, নাকি এটি বড় বড় জাহাজ মালিকদের দায়মুক্তির একটি ‘সনদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে?

 অনুমোদিত ইয়ার্ডে অনিরাপদ মৃত্যু

বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭টি ইয়ার্ড হংকং কনভেনশনের আওতায় অনুমোদিত। নিয়ম অনুযায়ী, এই ইয়ার্ডগুলোতে উন্নত প্রযুক্তিতে জাহাজ ভাঙার কথা। কিন্তু এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের ২০২৫ সালের তথ্য বলছে, সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাগুলো এই অনুমোদিত ইয়ার্ডগুলোতেই ঘটছে।

বিপরীত বাস্তব: চট্টগ্রামে ‘কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড’ হংকং কনভেনশন অনুমোদিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ‘সিপিক এশিয়া’ (SEAPEAK ASIA) জাহাজটি ভাঙার সময় দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এমনকি রাতে জাহাজ ভেড়ানোর (Beaching) মতো নিষিদ্ধ কাজও সেখানে করা হয়েছে।

 অস্বচ্ছতার সংস্কৃতি

হংকং কনভেনশনের অন্যতম শর্ত হলো দুর্ঘটনার সঠিক তথ্য প্রকাশ করা। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের তথ্য বলছে, দুর্ঘটনার খবর প্রায়ই ধামাচাপা দেওয়া হয় অথবা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকে। তথ্য প্রকাশের এই অস্বচ্ছতা শ্রমিকদের জীবনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ ইয়ার্ডগুলো ‘নিরাপদ’ তকমা নিয়ে বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে।

 কনভেনশনের সীমাবদ্ধতা ও সমালোচকদের বক্তব্য

এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ইংভিল্ড জেনসেন সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, এই কনভেনশন নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মানদণ্ড বজায় রাখতে পারছে না। তার মতে:

সৈকতে জাহাজ ভেড়ানোর বা ‘বিচিং’ (Beaching) পদ্ধতিটি জন্মগতভাবেই ত্রুটিপূর্ণ।

হংকং কনভেনশন এই ঘাতক পদ্ধতিটিকে নিষিদ্ধ করার বদলে পরোক্ষভাবে বৈধতা দিচ্ছে।

ভারত ও বাংলাদেশের ভিন্ন চিত্র

ভারতে শতাধিক শিপব্রেকিং প্লট রয়েছে যেগুলোর ব্যক্তিগত ‘স্টেটমেন্ট অফ কমপ্লায়েন্স’ আছে, কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে হংকং কনভেনশনের আওতায় অনুমোদিত নয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ দ্রুত অনুমোদন পেলেও কাজের মানের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।

 জবাবদিহিতার দাবি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নামমাত্র নীতিমালা দিয়ে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ‘ব্যাসেল কনভেনশন’-এর কঠোর প্রয়োগ। অর্থাৎ, বিষাক্ত বর্জ্য বা জাহাজ এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে যে জবাবদিহিতা থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। জাহাজ যে দেশের মালিকের অধীনে থাকবে, সেই রাষ্ট্রকেও এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায় নিতে হবে।

কাগজে-কলমে ‘নিরাপদ’ তকমা লাগিয়ে সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ পাঠানো আদতে একটি প্রতারণা। আন্তর্জাতিক এই আইনগুলো যদি মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করে আর শ্রমিকের মৃত্যু ডেকে আনে, তবে এর আমূল সংস্কার এখন সময়ের দাবি।


পরবর্তী পর্বে থাকছে: ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা অন্ধকার জাহাজ বহর—কীভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি আর ছদ্মনাম ব্যবহার করে বাংলাদেশে বিষাক্ত জাহাজ পাঠানো হচ্ছে।