Home Second Lead ডাম্পার ২০২৫: দায়হীনতার বৈশ্বিক মানচিত্র

ডাম্পার ২০২৫: দায়হীনতার বৈশ্বিক মানচিত্র

পর্ব ৪:

সিরিজ প্রতিবেদন: মৃত্যুর সৈকতে বিষাক্ত জাহাজ

কামরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম:  নিজ দেশে উন্নত প্রযুক্তি এবং জাহাজ ভাঙার নিরাপদ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশ এবং শীর্ষ ধনী জাহাজ মালিকরা কেন দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতগুলোকে বেছে নিচ্ছেন?
এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের ২০২৫ সালের ‘ডাম্পার লিস্ট’ বা জাহাজ বর্জনকারীদের তালিকায় উঠে এসেছে এমন কিছু নাম, যারা পরিবেশ সুরক্ষার বড় বড় বুলি দিলেও বাস্তবে বিষাক্ত জাহাজ ডাম্পিংয়ে শীর্ষে।
১. শীর্ষ ডাম্পার চীন: ঘরে সুবিধা, বাইরে ডাম্পিং

২০২৫ সালের তালিকায় সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। গত বছর দেশটির মালিকানাধীন ২১টি জাহাজ দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ভাঙার জন্য পাঠানো হয়েছে।

বিস্ময়কর তথ্য: চীনের নিজস্ব ড্রাই-ডক (Dry-dock) বা উন্নত কারিগরি সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তারা স্রেফ মুনাফার জন্য নিজ দেশের নিরাপদ ইয়ার্ড ব্যবহার না করে ঝুঁকিপূর্ণ বিচিং পদ্ধতিকে বেছে নিয়েছে।

২. রানার-আপ: দক্ষিণ কোরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত

দক্ষিণ কোরিয়া (১৯টি জাহাজ) এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (১৭টি জাহাজ) এই তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে রয়েছে।

আইন লঙ্ঘন: ২০২৫ সালের জুন মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নতুন জাহাজ রিসাইক্লিং নীতিমালা কার্যকর হয়েছে, যা সৈকতে জাহাজ ভাঙা নিষিদ্ধ করে। অথচ দেশটির জলসীমা থেকেই অন্তত ৬০টি জাহাজ দক্ষিণ এশিয়ার সৈকতে ভাঙার জন্য রওয়ানা দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।

৩. গ্রিসের ‘শিপিং ম্যাগনেট’ ও কর্পোরেট অপরাধ

২০২৫ সালের ‘সবচেয়ে খারাপ কর্পোরেট ডাম্পার’ (Worst Corporate Dumper) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে গ্রিসের প্রভাবশালী জাহাজ ব্যবসায়ী ভ্যাঞ্জেলিস মারিনাকিসকে

অনুসন্ধানী তথ্য: ‘রিপোর্টার্স ইউনাইটেড’-এর তদন্তে দেখা গেছে, মারিনাকিস নিয়ন্ত্রিত কোম্পানিগুলো ‘ট্রেডার ৩’ (TRADER III) নামক একটি বিষাক্ত ট্যাংকার তুরস্ক ও গ্রিস হয়ে শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের বিএসবি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পাঠিয়েছে। ইইউ আইন এড়াতে তারা অত্যন্ত চতুরতার সাথে বিভিন্ন লেনদেন সম্পন্ন করে। একই মালিকের আরেকটি জাহাজ ‘ট্রেডার ২’-ও সেপ্টেম্বরে একই পরিণতি বরণ করে।

৪. দায়হীনতার তালিকায় বিশ্বখ্যাত নামগুলো

তালিকায় শুধু চীন বা গ্রিস নয়, রয়েছে বিশ্বের নামী-দামী অনেক কোম্পানি:

সুইস জায়ান্ট MSC, জাপানের NYK LineMitsui OSK, এবং দক্ষিণ কোরিয়ার Hyundai LNG Shipping
ক্যাশ বায়ার হিসেবে পরিচিত জিএমএস-এর জাহাজ মালিকানা শাখা লিলা গ্লোবালও বহু জাহাজ ভারত ও বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।

৫. ইচ্ছাকৃত উদাসীনতা

গ্রিসের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভাষায়, এটি কেবল ব্যবসা নয়, এটি একটি “ইচ্ছাকৃত উদাসীনতার নীতি”। ইউরোপের শক্তিশালী শিপিং মালিকরা তাদের বিষাক্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ এড়াতে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর এই বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।

উপসংহার: চীনের প্রযুক্তি বা গ্রিসের আভিজাত্য—কোনোটিই তাদের এই নৈতিক স্খলনকে আড়াল করতে পারছে না। আন্তর্জাতিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চালানো এই ‘কর্পোরেট ডাম্পিং’ দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী বিষফোঁড়া।


  • পরবর্তী পর্বে থাকছে: ‘ফ্ল্যাগ হপিং’ বা পতাকা বদলের রহস্য—কীভাবে রাতারাতি একটি জাহাজের পরিচয় বদলে দিয়ে আইনকে ফাঁকি দেওয়া হয়।