শামসুল ইসলাম, ঢাকা: তীব্র গরমে স্বস্তি পেতে রাস্তার ধারের এক গ্লাস আখের রস বা অ্যালোভেরা শরবতে চুমুক দিচ্ছেন? সাবধান! আপনার অজান্তেই আপনি গ্রহণ করছেন ভয়াবহ সব রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের (CARS) এক চাঞ্চল্যকর গবেষণায় উঠে এসেছে রাস্তার পানীয়র এই ভয়াবহ চিত্র।
গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড নিউট্রিশন অ্যান্ড এগ্রিকালচার রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী ড. মো. লতিফুল বারীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার আখের রস এবং অ্যালোভেরা শরবতের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণার ফলাফল বলছে:
আখের রস:
পরীক্ষা করা নমুনার মধ্যে ৮৯.৩ শতাংশ আখের রসেই পাওয়া গেছে ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া। এছাড়া ৬৯.৩ শতাংশ নমুনায় সালমোনেলা এবং ২৯.৩ শতাংশ নমুনায় ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি মিলেছে।অ্যালোভেরা শরবত:
এর অবস্থা আরও ভয়াবহ। ৯৬ শতাংশ অ্যালোভেরা শরবতের নমুনায় ই. কোলাই পাওয়া গেছে। এছাড়া ৮৫.৩ শতাংশ নমুনায় ভিব্রিও এবং ২১.৩ শতাংশ নমুনায় সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত হয়েছে।
জীবাণুর উৎস:
মগ ও গ্লাস গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু পানীয় নয়, যে মগ ও গ্লাসে শরবত পরিবেশন করা হয়, সেগুলোও জীবাণুর আখড়া। আখের রস সংগ্রহের ৮০ শতাংশ মগ এবং ৬৯.৩ শতাংশ গ্লাস ই. কোলাই দ্বারা দূষিত। একইভাবে অ্যালোভেরা শরবত তৈরির মগ ও গ্লাসেও উচ্চমাত্রায় সালমোনেলা ও ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, বিক্রেতারা গ্লাস বা মগগুলো পরিষ্কার করার জন্য যে পানি ব্যবহার করছেন তা বিশুদ্ধ নয় অথবা একই পানি বারবার ব্যবহার করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞের মত
এই গবেষণার প্রধান গবেষক ড. মো. লতিফুল বারী তাঁর প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন যে, ই. কোলাই-এর উপস্থিতি নির্দেশ করে যে এই পানীয়গুলো কোনোভাবে মলমূত্র দ্বারা দূষিত হয়েছে। সালমোনেলা এবং ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি সরাসরি টাইফয়েড, ডায়রিয়া এবং কলেরার মতো মারাত্মক পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। ঝুঁকি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধরণের পানীয় থেকে সংক্রমণের সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি।
দূষণের নেপথ্যে কী?
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আখ মাড়াই মেশিন স্থাপন, খোলা অবস্থায় উপকরণ রাখা, ধুলোবালি এবং বিক্রেতাদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাবই এই দূষণের প্রধান কারণ। অনেক ক্ষেত্রে বিক্রেতারা একই গামছা দিয়ে হাত ও মেশিন মোছেন এবং নিরাপদ পানির অভাবে সঠিক পদ্ধতিতে গ্লাস ধুতে পারেন না।
সুরক্ষায় করণীয়
গবেষণা প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে যে, বিক্রেতাদের নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া নিয়মিত তদারকি ও তদারকি জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ততদিন পর্যন্ত রাস্তার ধারের অনিরাপদ জুস বা শরবত পান করার আগে সচেতন হওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।