বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ব্যাংক রেজুলেশন বিল, ২০২৬’ দেশের ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায় এক নতুন এবং বিতর্কিত মোড় নিয়ে এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে এই নতুন আইনের মাধ্যমে ব্যাংক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের পুনরায় মালিকানায় ফেরার পথ সুগম করা হয়েছে। ফলে এস আলম বা নাসা গ্রুপের মতো বিতর্কিত গোষ্ঠীর আবারও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণে আসার আইনি সুযোগ তৈরি হলো।
আইনের নতুন ধারা ও শর্তাবলি
নতুন আইনের ১৮(ক) ধারা অনুযায়ী, রেজুলেশন প্রক্রিয়ায় যাওয়া কোনো ব্যাংকের আগের শেয়ারহোল্ডাররা মালিকানা ফিরে পেতে আবেদন করতে পারবেন। তবে এই সুযোগ পেতে বেশ কিছু কঠোর আর্থিক ও প্রশাসনিক শর্তারোপ করা হয়েছে:
অঙ্গীকারনামা: আবেদনকারীকে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সব আর্থিক সহায়তা ফেরত, নতুন মূলধন জোগান এবং আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধের বিস্তারিত পরিকল্পনা সম্বলিত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।
আর্থিক দায় পরিশোধ: মালিকানা ফিরে পেতে হলে সরকারকে দেওয়া বিনিয়োগের অন্তত ৭.৫০ শতাংশ অর্থ অবিলম্বে জমা দিতে হবে। অবশিষ্ট ৯২.৫০ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
তদারকি ও যাচাই: বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী দুই বছর পুনর্গঠিত ব্যাংকের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে একটি বিশেষ কমিটির সুপারিশে মালিকানা বাতিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া
এই আইন পাসের পর থেকেই অর্থনীতিবিদ ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে মিশ্র ও উদ্বেগমূলক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
জবাবদিহিতার সংকট: বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, এই বিধান কার্যত ব্যাংকিং খাত ধ্বংসকারীদের পুরস্কৃত করার শামিল। তার মতে, অর্থের উৎস নিশ্চিত না করে মালিকানা ফেরত দিলে তারা অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে, যা পুরো সংস্কার প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দেবে।
আমানতকারীদের ঝুঁকি: বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন সংসদে এই বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, অতীতে ব্যাংক ডুবলে দায় আগে শেয়ারহোল্ডারদের নিতে হতো, কিন্তু নতুন কাঠামো সেই ভারসাম্য নষ্ট করে আমানতকারীদের সুরক্ষা ও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
সরকারের অবস্থান: বিরোধিতার জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। বাজারভিত্তিক সমাধানের মাধ্যমেই ব্যাংকগুলোকে সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তার দাবি, এই আইনের লক্ষ্য লুণ্ঠনকারীদের সুযোগ দেওয়া নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে স্থীতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছিল। এই ব্যাংকটির পুনর্গঠনে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিয়েছে এবং ক্ষুদ্র আমানতকারীদের পাওনা মেটাতে ১২ হাজার কোটি টাকার বীমা তহবিল ব্যবহার করা হচ্ছে। এস আলম গ্রুপের মতো গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে বিগত বছরগুলোতে ব্যাংক লুটের যে অভিযোগ রয়েছে, নতুন আইনের ফলে সেই অভিযুক্তরাই আবার প্রশাসনিক ক্ষমতায় ফিরবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারাও আশঙ্কা করছেন যে, শুধু অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া ব্যাংক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই আইন ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাবে নাকি বিশৃঙ্খলাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকির ওপর।
আগামীর প্রতিটি কনটেনট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য আমাদের সাথে শেয়ার করুন।