কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে গত দেড় দশকে যে কয়টি চরিত্র ক্ষমতার সমীকরণ বদলে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শুভেন্দু অধিকারী। ২০১১ থেকে ২০২১—এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রধান সেনাপতি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তির অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে ২০২৬-এর এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে তিনি কেবল তাঁর প্রাক্তন দলনেত্রীর প্রধান প্রতিপক্ষই নন, বরং তাঁকে পরাজিত করে বাংলার ক্ষমতার অলিন্দে এক নতুন অধ্যায়ের কারিগর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
তৃণমূলের অজেয় সেনাপতি (২০১১-২০২০): মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারীর উত্থান মূলত ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বাম সরকারের ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের প্রধান রণকৌশলী ছিলেন তিনি। ২০১১ সালে তৃণমূলের ঐতিহাসিক জয়ের পেছনে তাঁর ‘ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি’র ভূমিকা অনস্বীকার্য ছিল। সেই সময় থেকেই তিনি তৃণমূলের অঘোষিত ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ এবং দক্ষ সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পান। ২০১৬ সালে নন্দীগ্রাম থেকে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়ে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্ত্রিসভায় পরিবহণ এবং সেচ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলান। জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ—তৃণমূলের সাংগঠনিক প্রসারে তিনি ছিলেন মমতার বিশ্বস্ত সৈনিক।
বিদ্রোহ ও রূপান্তর: ২০২০ সালের শেষ দিকে তৃণমূলের অন্দরমহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং জেলা পর্যবেক্ষক পদ তুলে দেওয়া নিয়ে শুভেন্দুর সঙ্গে দলের দূরত্ব তৈরি হয়। ডিসেম্বরে মেদিনীপুরের এক বিশাল জনসভায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের উপস্থিতিতে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। যে মানুষটি একসময় ‘বিজেপি হটাও’ স্লোগান দিতেন, তিনিই হয়ে ওঠেন গেরুয়া শিবিরের বাংলার প্রধান মুখ।
২০২১-এর নন্দীগ্রাম এবং ২০২৬-এর ভবানীপুর: ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ১৯৫৬ ভোটে পরাজিত করেন শুভেন্দু। যদিও সেই নির্বাচনে তৃণমূল ক্ষমতায় ফেরে, কিন্তু শুভেন্দু বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তৃণমূল সরকারের কড়া সমালোচক হয়ে ওঠেন। আরজি কর কাণ্ড থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতি—প্রতিটি ইস্যুতে তিনি রাজপথে নেমে সরকারের ওপর চাপ বজায় রেখেছিলেন।
নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়: ২০২৬-এর এই নির্বাচনে ভবানীপুর আসনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৫,১০৫ ভোটে পরাজিত করা এবং একইসঙ্গে নন্দীগ্রামে নিজের আধিপত্য বজায় রাখা—শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। একসময়ের সেনাপতি আজ কেবল নিজের জায়গা ধরে রাখতেই সক্ষম হননি, বরং তাঁর প্রাক্তন নেত্রীকে সংসদীয় লড়াইয়ে পর্যুদস্ত করে বাংলার রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দুর এই জয় কেবল একটি আসনের জয় নয়, এটি দীর্ঘ দশ বছরের রাজনৈতিক রূপান্তরের এক চূড়ান্ত পরিণতি।