জার্মানির এই শহরটায় বসন্তের আমেজ শুরু হলেও এখনো বাতাসের ঝাপটায় কনকনে হিম লাগে। ডরমিটরির জানালার পাশে বসে আজ বারবার আমার দেশের সেই তপ্ত রোদের কথা মনে পড়ছে, যেখানে ঘরের ভেতর মা আমার পছন্দের লেবুর শরবত নিয়ে অপেক্ষা করতেন। আজ বিশ্ব মা দিবস, প্রবাসের এই ব্যস্ত জীবনে দিনটি ক্যালেন্ডারের পাতায় নীরবে এলেও মনের গহীনে এক বিশাল হাহাকার বয়ে নিয়ে এসেছে।
বছর দুই আগে যখন উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি আসি, তখন ভেবেছিলাম আমি অনেক শক্ত মনের মানুষ। কিন্তু এখানকার ডাইনিংয়ে একা বসে যখন কোনো বিদেশি খাবার খাই, তখন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে মায়ের হাতের সেই গরম ভাতের স্বাদ। মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা, যখন পড়ার টেবিলে রাত জাগলে মা নিঃশব্দে এক গ্লাস দুধ বা ফল দিয়ে যেতেন। আমি হয়তো বিরক্ত হয়ে বলতাম, “মা, যাও তো! ডিস্টার্ব করো না।” মা শুধু একটু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যেতেন। আজ সেই হাতটার অভাব বোধ করি প্রতিটি মুহূর্তে।
এখানকার জীবন খুব যান্ত্রিক। নিজের রান্না, নিজের কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে পড়াশোনার চাপে অনেক সময় ঠিকমতো দম ফেলার সুযোগ পাই না। মাঝে মাঝে খুব ক্লান্তি লাগে, মনে হয় সব ছেড়েছুড়ে দেশে ফিরে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই যখন মায়ের সাথে ভিডিও কলে কথা হয়, তার ক্লান্ত চোখের ভেতরের গর্বিত উজ্জ্বলতা দেখি, তখন সব কষ্ট উবে যায়। মা বলেন, “তুই অনেক বড় হবি মা, তোর জন্য আমি সারাক্ষণ দোয়া করি।” নিজের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে মা আমাকে এই স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন।
আজ সকালে মাকে ফোন দিয়েছিলাম। মা জিজ্ঞেস করলেন, “আজ নাকি মা দিবস? টিভিতে দেখাল।” আমি বললাম, “হ্যাঁ মা, আজ তোমার দিন।” মা হাসলেন, সেই চেনা স্নিগ্ধ হাসি। বললেন, “আমার জন্য তো প্রতিদিন মা দিবস, যখন তুই সুস্থ থাকিস আর ভালো থাকিস।” বুঝতে পারলাম, পৃথিবীর সব প্রান্তেই মায়েরা বুঝি একই রকম। নিজের কোনো চাহিদা নেই, কেবল সন্তানের ভালো থাকাই তাদের একমাত্র প্রাপ্তি।
এখানকার চার্চের সামনের দোকানে অনেক সুন্দর সুন্দর টিউলিপ আর গোলাপ বিক্রি হচ্ছে। ভাবছি, আজ যদি দেশে থাকতাম, একগুচ্ছ ফুল নিয়ে মায়ের সামনে দাঁড়াতাম। কিন্তু হাজার মাইল দূর থেকে আজ কেবল এটুকুই প্রার্থনা—পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুক। মায়ের দোয়া আর ভালোবাসাই যেন আমার এই কঠিন পথ চলার শক্তি হয়ে থাকে।
মায়ের সাথে কাটানো আপনার কোনো বিশেষ স্মৃতি থাকলে আমাদের জানাতে পারেন। businesstoday24.com ফলো করুন।