Home Second Lead খাঁটি সরিষার তেল জালিয়াতি: ঝাঁঝালো ঘ্রাণের আড়ালে বিষ

খাঁটি সরিষার তেল জালিয়াতি: ঝাঁঝালো ঘ্রাণের আড়ালে বিষ

সিরিজ প্রতিবেদন

পকেটে সিঁধ: ভোক্তার প্রতিদিনের লড়াই 

কামরুল হাসান
বাঙালির ভর্তা-ভাত কিংবা আচার—সরিষার তেল ছাড়া অসম্পূর্ণ। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ সয়াবিন ছেড়ে এখন ‘ঘানিভাঙা’ বা ‘কোল্ড প্রেসড’ সরিষার তেলের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে তেলটিকে আপনি ১০০০% খাঁটি মনে করে চড়া দামে কিনছেন, তার ভেতরে সরিষার দানা আছে হয়তো মাত্র ২০ শতাংশ? বাকিটা সস্তা পাম অয়েল, পোড়া মবিল কিংবা ক্ষতিকর ‘আর্জিমোন’ বীজের তেল। এই ‘ডিজিটাল ঝাঁঝ’ আপনার লিভার ও হার্টের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে।
বিজনেসটুডে২৪-এর অনুসন্ধানে সরিষার তেল বাজারের কিছু ভয়ংকর কারসাজি বেরিয়ে এসেছে।
 যেভাবে চলে ‘ঝাঁঝালো’ জালিয়াতি

১. কৃত্রিম ঝাঁঝ ও অ্যালিল আইসোথায়োসায়ানেট: খাঁটি সরিষার তেলের স্বাভাবিক ঝাঁঝ থাকে। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীরা সস্তা সয়াবিন বা পাম অয়েলের সাথে ‘অ্যালিল আইসোথায়োসায়ানেট’ (Allyl Isothiocyanate) নামক কেমিক্যাল মিশিয়ে কৃত্রিম ঝাঁঝ তৈরি করে। এই কেমিক্যাল মেশালে কয়েক ফোঁটা তেলেই নাকে-মুখে ঝাপটা লাগে, যা সাধারণ মানুষ ‘খুবই খাঁটি’ বলে ভুল করেন। এটি পাকস্থলীর দেয়ালের মারাত্মক ক্ষতি করে।

২. রঙ ও টেক্সচার জালিয়াতি: সরিষার তেলের সোনালী-লালচে রঙ আনতে টেক্সটাইল ডাই বা কাপড়ের রঙ মেশানো হয়। এছাড়া তেলের ঘনত্ব বাড়াতে অনেক সময় ভাতের মাড় বা সস্তা আটা মেশানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে। এই রঙ সরাসরি রক্তকণিকা ও কিডনির কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

৩. আর্জিমোন (Argemone) তেলের মিশ্রণ: সরিষার বীজের সাথে দেখতে হুবহু মিল থাকা ‘শিয়ালকাঁটা’ বা আর্জিমোন বীজ মিশিয়ে তেল মাড়াই করা হয়। এই বিষাক্ত বীজের তেল মানুষের শরীরে ‘ড্রপসি’ বা হাত-পা ফুলে যাওয়ার মতো রোগ তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অন্ধত্বের কারণ হতে পারে।

৪. ‘ঘানিভাঙা’ লেবেলে ফাঁদ: রাস্তার পাশে বা সুপারশপে ‘কাঠের ঘানি’ সাজিয়ে রাখা হয় কেবল দেখানোর জন্য। আড়ালে বড় মেশিনে পচা বা নিম্নমানের সরিষার সাথে সস্তা রিফাইন্ড অয়েল মিশিয়ে বোতলজাত করা হয়। আপনি ঘানি দেখে বিশ্বাস করছেন, কিন্তু ভেতরে ঢুকছে ভেজাল।

খাঁটি সরিষার তেল চেনার ঘরোয়া উপায়:
হাতের তালুতে ঘর্ষণ: কয়েক ফোঁটা তেল হাতের তালুতে নিয়ে ভালো করে ঘষুন। যদি তেলের রঙ পাল্টে যায় বা হাতের তালুতে কোনো রঙের আস্তরণ পড়ে, তবে বুঝবেন এতে কৃত্রিম রঙ মেশানো আছে।
ফ্রিজিং টেস্ট (Freezing Test): একটি গ্লাসে কিছু সরিষার তেল নিয়ে ফ্রিজে ঘণ্টাখানেক রেখে দিন। যদি তেল জমাট বেঁধে যায় বা সাদা সাদা আস্তরণ পড়ে, তবে নিশ্চিত থাকুন এতে পাম অয়েল বা অন্য চর্বি মেশানো আছে। খাঁটি সরিষার তেল ফ্রিজে জমাট বাঁধে না।
সাদা কাগজের দাগ: সাদা কাগজের ওপর এক ফোঁটা তেল দিন। যদি শুকানোর পর কাগজে হলদেটে বা গাঢ় দাগ থেকে যায়, তবে তা ভেজাল। খাঁটি তেলের দাগ খুব হালকা ও স্বচ্ছ হয়।
স্বাভাবিক ঝাঁঝ বনাম কেমিক্যাল ঝাঁঝ: খাঁটি তেলের ঝাঁঝ নাকে লাগলেও চোখে বা গলায় তীব্র জ্বালাপোড়া তৈরি করবে না। যদি তেল খোলার সাথে সাথেই চোখ দিয়ে পানি পড়ে বা গলা ধরে আসে, তবে বুঝবেন এতে কেমিক্যাল মেশানো হয়েছে।
সরিষার তেল কেবল খাবার নয়, এটি অনেক সময় মালিশের কাজেও লাগে। ভেজাল তেল চামড়ায় অ্যালার্জি ও ফুসকুড়ি তৈরি করতে পারে। বাজারের খোলা তেল না কিনে বিশ্বস্ত উৎস বা বিএসটিআই অনুমোদিত ব্র্যান্ডের তেল কিনুন। অনিয়ম দেখলে সরাসরি ভোক্তা অধিকারের হটলাইন ১৬১২১ নম্বরে অভিযোগ করুন।