চিকিৎসা মাঝপথেই থামছে অনেকের
হেলথ ডেস্ক: কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে আসা মর্জিনা বেগমের (ছদ্মনাম) হাতে ওষুধের ফর্দ, চোখেমুখে রাজ্যের হতাশা। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের বারান্দায় বসে তিনি যখন কথা বলছিলেন, তখন তার চোখের জল শুকিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “ছয়টা কেমো দিতে হইবো। দুইটা দেওয়ার পরই জমানো টাকা শেষ। স্বামী কইছে, আর জমি বেচতে পারবো না, আল্লাহ যা করে। এখন চিকিৎসা ছাইড়া বাড়ি ফিরা যাওয়া ছাড়া উপায় নাই।”
মর্জিনার এই গল্প কেবল একার নয়। বাংলাদেশে স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ার পর চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে হাজারো মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবার নিঃস্ব হচ্ছে। আর টাকার অভাবে মাঝপথেই চিকিৎসা থামিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন অসংখ্য নারী।
ভিটেমাটি বিক্রি করেও কুলিয়ে ওঠা দায়
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং হরমোন থেরাপির দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। সরকারি হাসপাতালে খরচ কিছুটা কম হলেও, রোগীর চাপ, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং ওষুধের অপ্রতুলতায় বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে গিয়েই ফতুর হন রোগীরা। বেসরকারি হাসপাতালে এই খরচ ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। অনেক পরিবার এই বিপুল অর্থের জোগান দিতে গিয়ে ভিটেমাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ে। ফলে, পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায় এবং একপর্যায়ে অর্থের অভাবেই চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যায়।
শহরের সুবিধা গ্রামে নেই: ভুল চিকিৎসায় প্রাণহানি
ঢাকা বা বিভাগীয় শহরের বাইরে ক্যান্সার চিকিৎসার সুযোগ এখনো অপ্রতুল। মফস্বল বা গ্রামের নারীরা যখন স্তনে কোনো চাকা বা অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করেন, তখন তারা প্রথমে স্থানীয় ফার্মেসি বা কবিরাজের কাছে যান। গ্রামের অনেক হাতুড়ে ডাক্তার একে সাধারণ ‘ফোড়া’ বা ‘বাতাসের দোষ’ বলে ভুল চিকিৎসা দেন।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “গ্রাম থেকে যখন রোগীরা আমাদের কাছে আসেন, তখন অনেকেরই ক্যান্সার ছড়িয়ে গেছে (মেটাসট্যাসিস)। ভুল চিকিৎসায় কালক্ষেপণ না হলে হয়তো তাদের বাঁচানো সম্ভব হতো। এছাড়া চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসা, থাকা ও খাওয়ার খরচ মেটাতে না পেরেও অনেক গ্রামীণ নারী চিকিৎসা নিতে অনীহা প্রকাশ করেন।”
‘রোগের চেয়েও বড় যন্ত্রণা সমাজ’
শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও স্তন ক্যান্সার রোগীদের বড় লড়াইটা করতে হয় মানসিক ও সামাজিকভাবে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক পরিবার মনে করে ক্যান্সার ছোঁয়াচে অথবা এটি কোনো পাপের ফল। বিশেষ করে স্তন কেটে ফেলার (Mastectomy) প্রয়োজন হলে নারীরা তীব্র হীনম্মন্যতায় ভোগেন।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত জানলে স্বামীরা দ্বিতীয় বিয়ের হুমকি দেন বা স্ত্রীকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেন। একজন ভুক্তভোগী নারী বলেন, “অসুখ হইছে বইলা স্বামী আমারে আর আগের চোখে দেখে না। মনে হয় আমি পরিবারের বোঝা। এই অবহেলা ক্যান্সারের চেয়েও বেশি কষ্টের।”
পরিবারের অসহযোগিতা এবং সমাজের বাঁকা চোখের কারণে অনেক নারী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, যা তাদের চিকিৎসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
👉 পাশে দাঁড়ান, সাহস দিন!
ক্যান্সার কোনো অভিশাপ বা ছোঁয়াচে রোগ নয়। আপনার পরিবারের বা পরিচিত কোনো নারী এই লড়াইয়ে থাকলে তাকে অবহেলা করবেন না। চিকিৎসার খরচে সাধ্যমতো সহায়তা করুন এবং মানসিকভাবে সাহস জোগান।
“রোগীকে নয়, ঘৃণা করুন রোগকে। সঠিক চিকিৎসায় ও মানসিক সমর্থনে স্তন ক্যান্সার জয় করা সম্ভব।”









