Home Second Lead সমপদের লড়াই: যখন সহকর্মীই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ

সমপদের লড়াই: যখন সহকর্মীই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ

অফিস রাজনীতি-৩

মো. আজগর আলী

অফিস রাজনীতির সবচেয়ে সূক্ষ্ম অথচ বিধ্বংসী রূপটি দেখা যায় যখন একই পদমর্যাদার দুজন বা তার বেশি কর্মকর্তার মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শুরু হয়। সিরিজের আগের পর্বগুলোতে আমরা বড় বাবুদের দাবার চাল ও তোয়াজের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি। আজ তৃতীয় পর্বে থাকছে সেই অদৃশ্য দেয়ালের গল্প, যা একই সমতলে কাজ করা সহকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয় এবং পুরো অফিসের পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মধ্যে নিজেকে অন্যের চেয়ে ‘কিছুটা সিনিয়র’ বা ‘অপরিহার্য’ প্রমাণ করার এক আদিম আকাঙ্ক্ষা থাকে। যখন দুজন কর্মকর্তা একই পদে কাজ করেন, তখন কাজের সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে অনেক সময় শুরু হয় ইগোর লড়াই। এই লড়াইয়ের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে দলবাজির মাধ্যমে। অফিসের ভেতর তৈরি হয় দুটি ভিন্ন বলয়। এক গ্রুপে ভিড় করেন সেইসব কর্মীরা, যারা জানেন যে কাজ না করেও তোয়াজ করে বা গ্রুপিংয়ের ছত্রছায়ায় থাকলে সুরক্ষা পাওয়া যাবে। অন্যদিকে দ্বিতীয় গ্রুপে থাকেন তারা, যারা শুধু কাজটুকুই করতে চান কিন্তু প্রতি পদে বাধার সম্মুখীন হন।
এই দ্বিমুখী চরিত্রের কর্তারা সবসময় একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে রাখেন। তাদের সবচেয়ে বড় সতর্কতা থাকে যাতে কোনো অধঃস্তন কর্মী বা যোগ্য অফিসার সরাসরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাতে না পারে। নিচতলার কোনো সত্য যেন ওপরতলায় না পৌঁছায়, সেজন্য তিনি সব যোগাযোগের পথ আগলে রাখেন। এর ফলে মালিকপক্ষ শুধু বড় বাবুর চশমা দিয়েই পুরো অফিসকে দেখেন, আর যোগ্য কর্মীরা থেকে যান সেই অন্ধকার কুঠুরিতে।
চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা থেকে বলছিলেন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির কথা। তিনি লক্ষ্য করেছেন, তাদের ব্যাংকের একটি শাখায় দুজন সমপদমর্যাদার কর্মকর্তার রেষারেষিতে পুরো অফিসটাই যেন আড়াআড়ি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। এমনকি দুপুরের লাঞ্চ ব্রেক বা বিকেলের চায়ের আড্ডাও এখন দুটি আলাদা ক্যাম্পে চলে। এক ক্যাম্পের কেউ অন্য ক্যাম্পের কারও সাথে কথা বললে তাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে দেখা হয়। এই ধরনের বিভাজন শুধু কর্মপরিবেশ নষ্ট করে না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক চেইন অফ কমান্ডকেও ভেঙে চুরমার করে দেয়।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার কোচ এবং হিউম্যান রিসোর্স বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধরনের ‘পিয়ার কনফ্লিক্ট’ বা সহকর্মীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্যান্সারের মতো। এর ফলে অফিসের করিডোরে কান পাতলে শুধু ফিসফাস, ছোটখাটো অভিযোগ আর পেছন থেকে কানাঘুষার শব্দ শোনা যায়। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। ফলে জরুরি কোনো প্রজেক্টে যখন দলগত প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়, তখন একে অপরকে টেনে নিচে নামানোর চেষ্টায় পুরো প্রজেক্টটিই ভেস্তে যায়। নেতৃত্বের যদি শক্ত হাতে এই ধরনের গ্রুপ কালচার বন্ধ করতে না পারে, তবে দক্ষ কর্মীরা এক সময় হাঁপিয়ে ওঠেন এবং ইস্তফা দিতে বাধ্য হন।
আগামী পর্বে : মুখোশের আড়ালে ছুরি ও দ্বিমুখী আচরণের সমাজতত্ত্ব
এই প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনার মতামত কী? অফিস রাজনীতির এমন অভিজ্ঞতা কি আপনার কর্মজীবনেও ঘটেছে? আপনার মন্তব্য আমাদের জানান নিচের কমেন্ট বক্সে। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করুন।
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও করপোরেট জগতের নিয়মিত আপডেট পেতে ভিজিট করুন: 🌐 www.businesstoday24.com
আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিন এবং ফলো করুন সবশেষ খবরের জন্য। আপনার চারপাশের ঘটে যাওয়া এমন সব সত্য ঘটনা আমাদের জানাতে পারেন।