Home Second Lead বড় বাবুর দাবার চাল ও বিভাজন নীতির ব্যবচ্ছেদ

বড় বাবুর দাবার চাল ও বিভাজন নীতির ব্যবচ্ছেদ

অফিস রাজনীতি-২

মো. আজগর আলী

সিরিজের প্রথম পর্বে আমরা দেখেছি কীভাবে তোয়াজের সংস্কৃতি দক্ষ কর্মীদের কোণঠাসা করে ফেলে। আজ দ্বিতীয় পর্বে আমরা আলোচনা করব অফিস রাজনীতির আরেকটি ধূর্ত কৌশল — ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা বিভাজন ও শাসন। অনেক বড় বাবু বা সিনিয়র কর্মকর্তা নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে এবং অধীনস্থদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে খুব সুক্ষ্মভাবে অফিসের ভেতরে একাধিক গ্রুপ বা উপদল তৈরি করে রাখেন। তাদের এই দাবার চালে বিষাক্ত হয়ে ওঠে অফিসের পুরো পরিবেশ।
হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ব্যবস্থাপক নিজেদের অযোগ্যতা বা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তারা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের চেয়ে নিজের ক্ষমতা ধরে রাখাকে বেশি গুরুত্ব দেন। এই ধরনের মানসিকতার managers অধীনস্থদের মধ্যে সুসম্পর্ক বা একতা মোটেও পছন্দ করেন না। কোনো দুজন কর্মীর মধ্যে ঘনিষ্ঠতা দেখলেই তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েন — পাছে তারা একজোট হয়ে তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বসে! তাই তারা অত্যন্ত কৌশলে বিষের বীজ বপন করেন।
একটি ক্লাসিক উদাহরণ হতে পারে এমন: “আরে, আপনাদের তো খুব ঘনিষ্ঠ দেখলাম! কিন্তু কাল ওই কাজটা নিয়ে উনি আপনার সম্পর্কে খুব অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। সম্পর্কে চিড় ধরল নাকি?” ব্যস, মাত্র কয়েকটা বাক্যে দুজনের মধ্যে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে গেল।
বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সাবেক বার্তা সম্পাদক আহসান হাবিব (ছদ্মনাম) এক ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরলেন। তিনি বলছিলেন, রাজধানীর একটি দৈনিকের চট্টগ্রাম অফিসে কীভাবে তাদের বার্তা কক্ষে দুজন তুখোড় ও প্রতিভাবান রিপোর্টারের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা হয়েছিল। ‘বড় বাবু’ জানতেন, এই দুজন এক থাকলে তার একচ্ছত্র আধিপত্য হুমকির মুখে পড়বে। তাই তিনি একজনের কাছে অন্যজনের নামে মিথ্যা কানকথা ছড়াতেন।
একজনকে বলতেন, “ও তো আপনার বিরুদ্ধে লেগে আছে। ”, আর অন্যজনকে বলতেন, “ও আপনার পিছনে ম্যানেজমেন্টের কাছে বদনাম করছে”। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো; দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে গেল, তাদের মধ্যে শুরু হলো তীব্র রেষারেষি। আর এই সুযোগে বড় বাবু নিজের আসন আরও পাকাপোক্ত করলেন। তবে, এক পর্যায়ে তিনিও চাকরিছাড়া হয়েছেন কুকর্মের পরিণতিতে।
এই ‘গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট’ বা দলবাজির কারণে অফিসের পরিবেশ এতটাই কলুষিত হয় যে, সেখানে কাজের চেয়ে পরনিন্দা ও পরচর্চাই প্রধান হয়ে ওঠে। দুই বা ততোধিক গ্রুপের মধ্যে চলে অনবরত চাপান-উতোর, ছোটখাটো অভিযোগ এবং পেছন থেকে ছুরি মারার খেলা। যারা কাজ করতে চান, তারা প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হন। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং ভালো কর্মীরা হতাশ হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন। নেতৃত্ব যদি এই বিভাজনের রাজনীতি বন্ধ করতে না পারে, তবে প্রতিষ্ঠান কখনোই তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারে না।
বড় বাবুর নিয়ন্ত্রণের কৌশল:
এই কর্তাবাবুদের আরেকটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো—তারা একান্ত অপারগ না হলে খুব একটা ছুটি নিতে চান না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি খুব নিবেদিতপ্রাণ, কিন্তু এর পেছনে থাকে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক চাল।
তিনি ভয় পান যে, তিনি ছুটিতে থাকলেও যদি অফিসের কাজ স্বাভাবিকভাবে চলতে থাকে, তবে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বুঝে ফেলবে যে তিনি আসলে ‘অপরিহার্য’ নন। তাই মহাপ্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তিনি অফিসে পড়ে থাকেন এবং কর্তৃপক্ষকে বোঝান যে, তার অনুপস্থিতিতে কাজে পদে পদে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। আসলে তিনি চান না মালিকপক্ষ কোনোভাবেই জানুক যে তাকে ছাড়াও সিস্টেম সচল থাকা সম্ভব।

এই প্রতিবেদনটি সম্পর্কে আপনার মতামত কী? অফিস রাজনীতির এমন অভিজ্ঞতা কি আপনার কর্মজীবনেও ঘটেছে? আপনার মন্তব্য আমাদের জানান নিচের কমেন্ট বক্সে। প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদের সচেতন করুন।
 পরবর্তী পর্বে থাকছে: সমপদের লড়াই: যখন সহকর্মীই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ
দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও করপোরেট জগতের নিয়মিত আপডেট পেতে ভিজিট করুন: 🌐 www.businesstoday24.com