বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: ক্ষমা করো মেজবাহ, ক্ষমা করো জাহিদ। আমরা আবারও ব্যর্থ হলাম। আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখন আকাশে পাড়ি জমাচ্ছি, তখন মাটির নিচের মাত্র কয়েক ফুটের একটি অন্ধকার গর্ত থেকে তোমাদের রক্ষা করতে পারলাম না। আমাদের সম্মিলিত দায়িত্বহীনতা আজ আরও একটি নিষ্পাপ শৈশবকে গিলে খেল।
অভিশপ্ত সেই গর্ত
বুধবার বিকেলে চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের বড়ুয়াপাড়ায় মেজবাহ যখন খেলছিল, সে হয়তো জানত না তার পায়ের নিচেই ওত পেতে আছে সাক্ষাৎ যম। মাত্র ৩ বছরের শিশুটি মুহূর্তেই পড়ে যায় একটি অরক্ষিত গভীর নলকূপের গর্তে। ৫টা ৩০ মিনিট থেকে রাত সাড়ে ৮টা—দীর্ঘ তিন ঘণ্টা সেই সংকীর্ণ গর্তে প্রাণের লড়াই চালিয়েছে মেজবাহ। ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিটের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর যখন তাকে বের করা হলো, ততক্ষণে সব শেষ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ভাইরাল সেই বাঁশ ও একরাশ হাহাকার
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, স্থানীয়রা গর্তের ভেতরে একটি বাঁশ ফেলে মেজবাহকে বারবার বলছিলেন সেটা আঁকড়ে ধরতে। সে হয়তো বাঁশটি ধরার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু আমাদের জরাজীর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা তাকে টেনে তুলতে পারেনি। এই দৃশ্যটি দেশবাসীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটালেও, তা আমাদের প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত গাফিলতিকে মুছে দিতে পারবে না।
জাহিদ থেকে মেজবাহ: ইতিহাসের নির্মম পুনরাবৃত্তি
মেজবাহর এই করুণ বিদায় মনে করিয়ে দেয় ২০১৪ সালে রাজশাহীর শিশু জাহিদের কথা। কিংবা অতি সম্প্রতি বৃহত্তর রাজশাহীর নওগাঁয় ঘটে যাওয়া সেই একই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার কথা, যা দেশজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল। প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত হয়, আলোচনা হয়, কিন্তু অরক্ষিত গভীর নলকূপের গর্তগুলো মৃত্যুফাঁদ হয়ে রয়েই যায়।
দায়িত্ব কার? গভীর নলকূপ স্থাপন করার পর তার মুখ খোলা রাখা কিংবা পরিত্যক্ত গর্ত ভরাট না করা কি কেবলই দুর্ঘটনা? নাকি এটি স্পষ্ট অপরাধ? বাড়ির আঙিনায় বা জনপদে এমন উন্মুক্ত মরণফাঁদ যারা তৈরি করে রাখেন, তাদের এই চরম দায়িত্বহীনতার মাশুল দিতে হলো মেজবাহকে। মেজবাহ ও জাহিদের মতো শিশুদের প্রাণের বিনিময়ে কি আমাদের বিবেক জাগবে না?
রাউজান থানার ওসি মো: সাজেদুল ইসলাম এবং ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল মান্নান উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। কেউ কি মেজবাহর পরিবারের শূন্যতা পূরণ করতে পারবেন? আমাদের অবহেলার গর্তে আর কত মেজবাহর বিসর্জন দিলে আমরা সচেতন হব?