আজহার মুনিম শাফিন, লন্ডন: ব্রিটেনের অভিবাসন ব্যবস্থায় ইতিহাসের অন্যতম বড় জালিয়াতির ঘটনা ফাঁস! পড়াশোনা বা চাকরির স্বপ্ন নিয়ে ব্রিটেনে পাড়ি জমানো লক্ষাধিক অভিবাসীর ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অন্ধকারের মুখে। ব্রিটিশ হোম অফিসের সাম্প্রতিক এক তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য— যোগ্যতা নয়, বরং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জালিয়াতি করে ইংরেজি ভাষার দক্ষতা পরীক্ষার সনদ নিয়ে ব্রিটেনে ঢুকেছেন হাজার হাজার মানুষ। এই অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই প্রায় ৮০ হাজার অভিবাসীর ভিসা বাতিল করেছে ঋষি সুনাকের প্রশাসন।
কীভাবে ঘটল এই মহাজালিয়াতি?
হোম অফিসের তদন্তকারী দল জানিয়েছে, এই জালিয়াতির শিকড় অনেক গভীরে। অভিযোগ উঠেছে, ব্রিটেনগামী শিক্ষার্থী এবং ওয়ার্ক পারমিট প্রত্যাশীরা আইইএলটিএস বা সমমানের পরীক্ষায় নিজেরা অংশ নেননি। এর বদলে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে ‘প্রক্সি’ বা ভুয়া পরীক্ষার্থী দিয়ে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও কেন্দ্রের অসাধু কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে পুরো উত্তরপত্রই জালিয়াতি করা হয়েছে। যারা ইংরেজি এক লাইনও ঠিকমতো বলতে বা লিখতে পারেন না, তাদের সনদেও শোভা পাচ্ছে ‘ব্যান্ড স্কোর ৭’ বা তার বেশি!
৮০ হাজার ভিসা বাতিল: আতঙ্কে প্রবাসীরা
হোম অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন এই জালিয়াতির তালিকায় লক্ষাধিক নাম থাকলেও, অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৮০ হাজার জনের ভিসা বাতিল করা হয়েছে। এদের মধ্যে একটি বড় অংশ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়া থেকে আসা শিক্ষার্থী ও কেয়ার ওয়ার্কার।
হোম অফিসের এক মুখপাত্র জানান, “ব্রিটেনের অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার আমরা কোনোভাবেই বরদাস্ত করব না। যারা মিথ্যা তথ্য ও ভুয়া সনদ দিয়ে এ দেশে প্রবেশ করেছে, তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
স্বপ্নভঙ্গ ও আইনি জটিলতা
যাদের ভিসা বাতিল করা হয়েছে, তাদের কাছে ইতিমধ্যেই চিঠি পাঠানো শুরু হয়েছে। চিঠিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, তাদের ব্রিটেনে থাকার বৈধতা শেষ। অবিলম্বে দেশ ত্যাগ না করলে তাদের জোরপূর্বক নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অনেকে আবার দাবি করছেন, তাঁরা নির্দোষ এবং আইনি লড়াইয়ে যাবেন। কিন্তু হোম অফিসের কঠোর অবস্থানে সেই সুযোগ কতটুকু পাওয়া যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
লন্ডনের এক অভিবাসন আইনজীবী বলেন, “এটি সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ক্র্যাকডাউন। যারা সত্যিই জালিয়াতি করেছেন, তাদের বাঁচার পথ নেই। তবে এর মাঝে কিছু প্রকৃত মেধাবী শিক্ষার্থীও প্রশাসনিক জটিলতায় বিপদে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।”
শুধু ভিসা বাতিলই নয়, এই ভুয়া সনদ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত কোচিং সেন্টার, কনসালটেন্সি ফার্ম এবং দালাল চক্রকে ধরতেও মাঠে নেমেছে ব্রিটিশ পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, এই জালিয়াতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য হয়েছে।
এই ঘটনার পর ব্রিটেন স্টুডেন্ট ও ওয়ার্ক পারমিট ভিসার ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করার ঘোষণা দিয়েছে। বর্তমানে ব্রিটেনে অবস্থানরত অভিবাসীদের মধ্যেও যাদের ইংরেজি দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে, তাদের পুনরায় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, ভুয়া সনদে আসা প্রবাসীদের জন্য ব্রিটেনের মাটি এখন ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।










