Home বিশেষ প্রতিবেদন কুয়াশার চাদরে আগুনের উত্তাপ: শীতে কেন বাড়ছে আগুনের ঘটনা?

কুয়াশার চাদরে আগুনের উত্তাপ: শীতে কেন বাড়ছে আগুনের ঘটনা?

আমিরুল মোমেনিন, ঢাকা: হিমেল হাওয়া আর কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে প্রকৃতিতে শীতের আগমন ঘটেছে। তবে এই ঋতু শুধু ঠান্ডাই নিয়ে আসে না, সঙ্গে নিয়ে আসে অগ্নিকাণ্ডের বাড়তি আতঙ্ক। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় শীত মৌসুমে দেশে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। শুষ্ক আবহাওয়া, দাহ্য বস্তুর প্রাপ্যতা এবং মানুষের অসচেতনতাই এর মূল কারণ।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের বিগত কয়েক বছরের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।

২০২৩ সালে সারা দেশে ২৭ হাজারের বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল, যার একটি বড় অংশই ঘটেছে শীতকালে।

সংস্থাটির তথ্যমতে, অগ্নিকাণ্ডের প্রায় ৩৮ শতাংশের সূত্রপাত হয় বৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শর্ট সার্কিট থেকে।

দ্বিতীয় প্রধান কারণ চুলার আগুন বা গ্যাসের লিকেজ, যা প্রায় ১৮-২০ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী।

শীতে কেন বাড়ে আগুন?
বিশেষজ্ঞরা শীতকালে আগুন বাড়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. শুষ্ক আবহাওয়া: শীতে বাতাসে আর্দ্রতা কমে যায়। ফলে কাঠ, বাঁশ, আসবাবপত্র এবং গাছপালা অত্যন্ত শুষ্ক থাকে। সামান্য আগুনের স্ফুলিঙ্গ পেলেই তা দ্রুত দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
২. গ্যাস লিকেজ ও বদ্ধ ঘর: শীতে ঠান্ডা থেকে বাঁচতে মানুষ ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ রাখেন। এই সময় গ্যাসের চুলা বা লাইন সামান্য লিক থাকলেও গ্যাস বের হতে পারে না এবং ঘরে জমে থাকে। সকালে দিয়াশলাই জ্বালাতেই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
৩. বিদ্যুতিক চাপ: শীতে ওয়াটার হিটার, রুম হিটার, গিজার এবং ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লাইট ব্যবহার বেড়ে যায়। পুরনো তার বা দুর্বল সংযোগ এই অতিরিক্ত লোড নিতে না পেরে শর্ট সার্কিট ঘটায়।
৪. আগুন পোহানো: গ্রামের দিকে এবং শহরের বস্তি এলাকায় খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহানোর সময় অসাবধানতাবশত কাপড়ে আগুন লেগে প্রতি বছরই বহু মানুষ দগ্ধ হন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক একজন পরিচালক বলেন, “শীতকালে পানির উৎসগুলো অনেক সময় শুকিয়ে যায় বা কমে যায়। ফলে আগুন লাগলে তাৎক্ষণিকভাবে পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া শহরের অপরিকল্পিত বিদ্যুতায়ন এবং মানহীন বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার আগুনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু ফায়ার সার্ভিস একা এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারবে না। প্রতিটি ভবনে নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা এবং মহড়া থাকা জরুরি।”

সচেতনতাই বাঁচার উপায়
মূল্যবান জীবন ও সম্পদ রক্ষায় এই মৌসুমে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে কিছু নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে:

  • রান্না শেষে চুলার আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলা এবং গ্যাসের চাবি ঠিকমতো বন্ধ করা।
  • রাতে ঘুমানোর আগে বা বাসা থেকে বের হওয়ার আগে মশার কয়েল ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম বন্ধ রাখা।
  • বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন ও সরঞ্জাম নিয়মিত দক্ষ টেকনিশিয়ান দিয়ে পরীক্ষা করানো।
  • শীতে আগুন পোহানোর সময় সিনথেটিক বা ঢিলেঢালা পোশাক এড়িয়ে চলা।
  • হাতের কাছে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র বা বালতিভ ভর্তি পানি ও বালু রাখা।

শীতের আমেজ যেন কান্নায় রূপ না নেয়, সেজন্য ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার বিকল্প নেই। সামান্য ভুলের মাশুল হতে পারে সারা জীবনের কান্না—এ কথা মনে রেখেই এই শুষ্ক মৌসুমে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

লাইক দিন 👍, শেয়ার করুন 🔁, এবং মন্তব্যে জানান আপনার মতামত!