ভারতের রাজস্থানে অবস্থিত খাজা মঈনউদ্দীন চিশতী (রহ.)-এর দরগাহ কেবল মুসলিমদের কাছেই নয়, বরং বিশ্বের সকল ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে এক পবিত্র স্থান। এই দরগাহর প্রধান প্রবেশপথ বা ‘বুলন্দ দরওয়াজা’ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে ডান ও বাম পাশে দুটি বিশালাকৃতির লোহার কড়াই নজরে পড়ে, যা স্থানীয়ভাবে ‘ডেগ’ নামে পরিচিত।
১. বড় ডেগ (আকবরী ডেগ)
দরগাহর মূল আঙিনায় প্রবেশের ডান দিকে অবস্থিত এই বিশাল পাত্রটি ১৫৬৭ সালে মুঘল সম্রাট আকবর উপহার দিয়েছিলেন।
ধারণক্ষমতা: এই ডেগটিতে একসাথে প্রায় ১২৫ মণ বা ৪,৮০০ কেজি চালের খাবার রান্না করা যায়।
নির্মাণশৈলী: এটি লোহা দিয়ে তৈরি এবং এর উপরিভাগের পরিধি অত্যন্ত বিশাল। এটি এতটাই বড় যে এর ভেতরে দাঁড়িয়ে রান্না করার জন্য বিশেষ মই বা ধাপ ব্যবহার করতে হয়।
২. ছোট ডেগ (জাহাঙ্গীরী ডেগ)
বাম দিকে অবস্থিত তুলনামূলক ছোট (কিন্তু সাধারণ হিসাব অনুযায়ী বিশাল) এই পাত্রটি ১৬১৩ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীর প্রদান করেছিলেন।
ধারণক্ষমতা: এতে প্রায় ৮০ মণ বা ২,৪০০ কেজি খাবার রান্না করা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: সম্রাট জাহাঙ্গীর খাজা বাবার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন স্বরূপ এই উপহারটি প্রদান করেন, যা আজও নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবারক প্রস্তুত ও রান্নার নিয়ম
এই ডেগগুলোতে যে খাবার রান্না করা হয় তাকে বলা হয় ‘তবারক’। সাধারণত এটি চাল, ঘি, চিনি এবং শুকনো ফল (ড্রাই ফ্রুটস) দিয়ে তৈরি করা এক প্রকার মিষ্টি ভাত, যা ‘কেশরি ভাত’ নামে পরিচিত।
নিরামিষ ঐতিহ্য: দরগাহর নিয়ম অনুযায়ী এই ডেগগুলোতে কখনোই মাংস রান্না করা হয় না। এটি সম্পূর্ণ নিরামিষ, যাতে সকল ধর্মের মানুষ কোনো দ্বিধা ছাড়াই এটি গ্রহণ করতে পারেন।
জ্বালানি: বিশাল এই ডেগগুলোর নিচে সরাসরি আগুন জ্বালানোর জন্য বিশেষ সুড়ঙ্গের মতো ব্যবস্থা রয়েছে। রান্নার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ এবং এতে একদল অভিজ্ঞ বাবুর্চি নিয়োজিত থাকেন।
তবারক লুণ্ঠন বা ‘লুট’ করার প্রথা
আজমীর শরীফে একটি বিশেষ ঐতিহ্য আছে যা ‘ডেগ লুট করা’ নামে পরিচিত। রান্নার পর খাবার যখন কিছুটা ঠান্ডা হয়, তখন একদল নির্দিষ্ট সেবক (যাদের বংশপরম্পরায় এই অধিকার দেওয়া হয়েছে) বিশেষ পোশাক পরে ডেগের ভেতরে নেমে যান এবং বালতি ভরে খাবার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ভক্তদের হাতে তুলে দেন। হাজার হাজার মানুষ পরম ভক্তিতে এই প্রসাদ গ্রহণ করেন।
সামাজিক ও মানবিক গুরুত্ব
এই ডেগগুলো কেবল রান্নার পাত্র নয়, এটি ইসলামের ‘লঙ্গর’ বা গণরান্নাঘরের মহান ঐতিহ্যের প্রতীক। কোনো ধনী ব্যক্তি বা মানতকারী যখন এই ডেগের রান্নার খরচ বহন করেন, তখন সেই খাবার জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে গরিব ও অসহায়দের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়। এটি মানবিক সেবা ও সামাজিক সাম্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
businesstoday24.com-এর সাথে যুক্ত থাকুন। এই প্রতিবেদনটি ভালো লাগলে আমাদের ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মন্তব্য শেয়ার করুন।