Home বিশেষ প্রতিবেদন রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু বাঁচাবে প্রাণ: ‘ইমোশনাল ডোনার’

রক্তের সম্পর্ক নেই, তবু বাঁচাবে প্রাণ: ‘ইমোশনাল ডোনার’

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: বন্ধুত্বের খাতিরে কিংবা দীর্ঘদিনের সহকর্মী হওয়ার সুবাদে কেউ মৃত্যুপথযাত্রী প্রিয়জনকে একটি কিডনি বা লিভারের অংশ দিতে চাইতেন, কিন্তু আইন ছিল বাধ সাধা এক প্রাচীর। ১৯৯৯ সালের আইনে রক্তের সম্পর্কের বাইরে অঙ্গ দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে চোখের সামনে বিনা চিকিৎসায় ঝরে গেছে অনেক প্রাণ। তবে ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ সেই প্রাচীর ভেঙে দিয়েছে। নতুন আইনে যুক্ত হয়েছে ‘ইমোশনাল ডোনার’ বা ‘নিঃস্বার্থবাদী দাতা-র ধারণা।

কিন্তু মানবিকতার এই দরজা খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঁকি দিচ্ছে এক ভয়ানক শঙ্কাও—আবেগের আড়ালে কি ঢুকে পড়বে অঙ্গ কেনাবেচার কালো সিন্ডিকেট?

কে হতে পারবেন ‘ইমোশনাল ডোনার’?
নতুন অধ্যাদেশের ২(৮) ও ৯ ধারা অনুযায়ী, রোগীর সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই, কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচয় বা আবেগীয় সম্পর্ক রয়েছে—এমন যে কোনো সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি স্বেচ্ছায় অঙ্গ দান করতে পারবেন। তিনি হতে পারেন রোগীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রতিবেশী, শিক্ষক, ছাত্র কিংবা সহকর্মী।

শর্ত হলো, এই দানের পেছনে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন বা জবরদস্তি থাকা যাবে না। দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্কের গভীরতা প্রমাণ করতে হবে।

অনুমোদনের ‘অগ্নিপরীক্ষা’: যাচাই কমিটি
কেউ চাইলেই হুট করে নিজেকে ‘ইমোশনাল ডোনার’ দাবি করে অঙ্গ দিতে পারবেন না। এর জন্য পার হতে হবে ১৬ নং ধারার অধীনে গঠিত ৪ সদস্যের ‘নিঃস্বার্থবাদী দাতা নির্ধারণ ও অনুমতি প্রদান কমিটি’-র কড়া নজরদারি। এই কমিটিতে থাকবেন:
১. মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (সভাপতি)।
২. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি।
৩. পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সুপারিনটেনডেন্ট পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
৪. জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক।

এই কমিটি দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে পুরোনো ছবি, ভিডিও, যোগাযোগের রেকর্ড (কল লিস্ট/মেসেজ) এবং অন্যান্য দালিলিক প্রমাণ যাচাই করবে। পুলিশ ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে যে দাতা কোনো মাদকাসক্ত ব্যক্তি নন কিংবা তিনি টাকার বিনিময়ে বা কোনো দালাল চক্রের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে অঙ্গ বিক্রি করছেন না। এছাড়া মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিশ্চিত করবেন যে দাতা মানসিকভাবে সুস্থ এবং সজ্ঞানে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

বাণিজ্যিকীকরণের শঙ্কা ও সতর্কবার্তা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ইমোশনাল ডোনার’ বিষয়টি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি এটি সঠিকভাবে মনিটরিং না করলে অভিশাপ হতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, বস্তিবাসী বা ঋণগ্রস্ত দরিদ্র মানুষকে টাকার লোভ দেখিয়ে ভুয়া আত্মীয় সাজিয়ে কিডনি বিক্রি করানো হতো। এখন ‘বন্ধু’ বা ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ সাজিয়ে একই কাজ করার চেষ্টা করতে পারে দালাল চক্র।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ নেফ্রোলজিস্ট নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নতুন আইনে সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু আমাদের দায়িত্বও বেড়েছে বহুগুণ। একজন গরিব মানুষ হঠাৎ করে একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর ‘২০ বছরের বন্ধু’ বা ‘ইমোশনাল ডোনার’ দাবি করে বসল—এটা বিশ্বাস করা কঠিন। কমিটি যদি এখানে কঠোর না হয়, তবে বাংলাদেশ অঙ্গ পাচারের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে পারে।”

আইনের কঠোর বর্ম
সরকার এই ঝুঁকির বিষয়ে সচেতন। অধ্যাদেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে, অঙ্গ কেনাবেচার প্রমাণ পাওয়া গেলে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি মিথ্যা তথ্য দিয়ে দাতা সাজার চেষ্টা করলেও ২ বছরের জেল ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার মুখে পড়তে হবে।

এছাড়া, দাতা ও গ্রহীতার ভিডিও সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ বা জালিয়াতি ধরা পড়লে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

মানবিকতা বনাম বাস্তবতা
রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন লিভার সিরোসিস রোগীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, “আমার স্বামীর আপন ভাই নেই। কিন্তু ওনার ছোটবেলার বন্ধু লিভার দিতে রাজি আছেন। আগের আইনে এটা অসম্ভব ছিল। ইমোশনাল ডোনারের নিয়মটা আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত।”

‘ইমোশনাল ডোনার’ বা নিঃস্বার্থবাদী দাতার স্বীকৃতি চিকিৎসাবিজ্ঞানে মানবিকতার বিজয়। তবে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যাতে কোনো অসহায় মানুষের শরীর অর্থের বিনিময়ে পণ্য না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসন ও চিকিৎসকদেরই। আবেগের নামে যেন বাণিজ্য না হয়—এটাই এখন ২০২৫-এর অধ্যাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লাইক দিন 👍, শেয়ার করুন 🔁, এবং মন্তব্যে জানান আপনার মতামত!