গাজীপুরে শেষ হলো এক ঐতিহাসিক অধ্যায়
বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, গাজীপুর: গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মিম্বরটি গতকাল শুক্রবার ছিল যেন কিছুটা ম্লান। যে কণ্ঠস্বর দীর্ঘ ৭২ বছর ধরে মুসল্লিদের সঠিক পথের দিশা দেখিয়েছে, সেই পরিচিত স্বরটি শেষবারের মতো বিদায়ী খুতবা দিল। সমাপ্তি ঘটল বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং নিষ্ঠাবান এক ইমামতি অধ্যায়ের।
টানা ৭২ বছর ১ দিন খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে জুমার নামাজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিলেন আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল হক পীর সাহেব।
কিশোর বয়সের শুরু, বার্ধক্যের বিদায়
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৫৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর। মাত্র ১৩ বছরের এক কিশোর, যিনি তখন সোনাকান্দা দারুল হুদা মাদরাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, পা রেখেছিলেন গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমামতির মিম্বরে। সেই থেকে শুরু। রোদ-বৃষ্টি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা মহামারীর দিন—সব পরিস্থিতিতেই তিনি ছিলেন অবিচল। ৮৭ বছর ২ মাস বয়সে এসে যখন তিনি বিদায় নিলেন, তখন তার পেছনে নামাজ আদায় করছেন এমন মুসল্লিও আছেন যাদের বাবা এবং দাদাও এই হুজুরের পেছনেই নামাজ পড়েছেন।
অশ্রুসিক্ত মুসল্লি ও এক বিরল দৃষ্টান্ত
জুমার নামাজে তিল ধারণের জায়গা ছিল না মসজিদে। খুতবার শুরু থেকেই এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিদায় বেলায় হুজুর যখন মুসল্লিদের কাছে দোয়া চাইলেন এবং কোনো ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাইলেন, তখন অনেক মুসল্লিকে অঝোরে কাঁদতে দেখা যায়। মসজিদ কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান বলেন, “আজকের দুনিয়ায় টাকার বিনিময়ে সব বিচার করা হয়, কিন্তু হুজুরের কাছে এই দীর্ঘ সেবা ছিল ত্যাগের। ১৩ বছর বয়সে শুরু করে আজ তিনি যখন থামলেন, তখন তিনি আমাদের অভিভাবক। তার মতো নিষ্ঠাবান ইমাম এখন পাওয়া দুষ্কর।”
ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার
মাওলানা আবদুল হক সাহেবের বিদায় মানেই কিন্তু এই পরিবারের সাথে মসজিদের বিচ্ছেদ নয়। মসজিদ কমিটি তার সুযোগ্য পুত্র আব্দুল কাদিরকে নতুন ইমাম হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আগে হুজুরের দাদা, বাবা এবং চাচাও এই মসজিদে ইমামতি করেছিলেন। ফলে এই পরিবারটি কয়েক প্রজন্ম ধরে গাজীপুরের এই কেন্দ্রীয় মসজিদের আধ্যাত্মিক বাতিঘর হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে।
অবসর কিন্তু বিচ্ছেদ নয়
শারীরিক দুর্বলতার কারণে স্বেচ্ছায় অবসর নিলেও হুজুর জানিয়েছেন, নিশ্বাস থাকা পর্যন্ত তিনি মসজিদের সাথেই থাকবেন। বিশেষ করে প্রতি জুমার নামাজে অংশগ্রহণ এবং পবিত্র রমজান মাসে মসজিদে ইতেকাফ পালন করবেন তিনি।
বিদায়বেলায় মুসল্লিদের একটাই কথা—৭২ বছরের এই দীর্ঘ পথচলা কেবল একটি রেকর্ড নয়, এটি একনিষ্ঠ ইবাদত এবং ভালোবাসার এক অনন্য মহাকাব্য। মাওলানা আবদুল হক পীর সাহেবের রেখে যাওয়া প্রজ্ঞা ও আদর্শ নতুন প্রজন্মের ইমামদের জন্য আজীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।










