তারিক-উল-ইসলাম, ঢাকা: জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। জাতিসংঘের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশে প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ কার্বন মার্কেট ফ্রেমওয়ার্ক’ (Bangladesh Carbon Market Framework)-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল।
প্যারিস চুক্তির প্রতিশ্রুতি ও বাংলাদেশের পদক্ষেপ
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ‘আর্টিকেল-৬’ অনুযায়ী, দেশগুলো একে অপরের সাথে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কৃতিত্ব বা ‘কার্বন ক্রেডিট’ বিনিময়ের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা হ্রাসে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ সরকার এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সাথে সংগতি রেখে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই ফ্রেমওয়ার্কটি দেশের পরিবেশ সুরক্ষায় একটি কৌশলগত মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কার্বন ক্রেডিট ও অর্থায়নের নতুন দিগন্ত
এই নতুন ফ্রেমওয়ার্কের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো জলবায়ু অর্থায়নকে গতিশীল করা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমায় এমন প্রকল্পের মাধ্যমে ‘মিটিগেশন আউটকামস’ (Mitigation Outcomes) বা কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারবে।
অর্জিত এই ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নত দেশ বা বড় কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
খসড়া নীতিমালার মূল দিকসমূহ ১. কার্বন রেজিস্ট্রি: প্রতিটি প্রকল্পের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘বাংলাদেশ কার্বন রেজিস্ট্রি’ নামে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
২. পজিটিভ লিস্ট: নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বনায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই কৃষির মতো খাতগুলোকে কার্বন ক্রেডিটের জন্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
৩. স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: প্রকল্পের পর্যবেক্ষণ, রিপোর্ট প্রদান এবং যাচাইকরণের (MRV) জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ফ্রেমওয়ার্ক বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধুমাত্র জলবায়ু তহবিলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ টানতে পারবে। এটি দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে এবং প্রযুক্তির হস্তান্তরে বড় ভূমিকা রাখবে।
মতামত আহ্বান: বর্তমানে এই খসড়া নীতিমালাটির ওপর জনসাধারণের মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অংশীজন এবং সাধারণ নাগরিকরা আগামী ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে ই-মেইলের মাধ্যমে তাদের সুচিন্তিত মতামত জানাতে পারবেন। প্রাপ্ত মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে।
এই উদ্যোগটি সফল হলে বাংলাদেশ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া দেশ হিসেবে নয়, বরং জলবায়ু সমাধান বা মিটিগেশনের ক্ষেত্রেও বিশ্ব দরবারে এক নতুন রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হবে।










