নিজের এক টুকরো জমিতে মাথা গোঁজার ঠাঁই পেতে কিস্তিতে বাড়ি নির্মাণের সুবিধা যেমন জনপ্রিয় হচ্ছে, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে থাকা কিছু ঝুঁকি ও সীমাবদ্ধতা নিয়েও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়া চুক্তিবদ্ধ হলে গ্রাহক বড় ধরনের আর্থিক ও আইনি বিপদে পড়তে পারেন।
১. অতিরিক্ত নির্মাণ ব্যয় ও প্রচ্ছন্ন সুদ এককালীন টাকা দিয়ে বাড়ি বানানোর তুলনায় কিস্তিতে বাড়ির নির্মাণ ব্যয় স্বাভাবিকভাবেই বেশি হয়। মাসিক কিস্তির সাথে সার্ভিস চার্জ বা প্রচ্ছন্ন মুনাফা যুক্ত থাকায় মোট খরচ বাজার দরের চেয়ে ২০% থেকে ৩০% পর্যন্ত বেশি হতে পারে। কিস্তি কম দেখাতে গিয়ে অনেক সময় দীর্ঘ মেয়াদী চুক্তিতে নেওয়া হয়, যাতে বছর শেষে দেখা যায় গ্রাহক মূল ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি টাকা পরিশোধ করছেন।
২. মালামালের গুণগত মান নিয়ে অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি থাকে মালামালের মান নিয়ে। রড, সিমেন্ট বা ইটের মতো মৌলিক জিনিসের মান শুরুতে ভালো দেখালেও ভেতরের গাঁথুনি বা ছাদে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ থেকে যায়। যেহেতু বাড়ির মালিক নিজে মালামাল কেনেন না, তাই কোম্পানির সততার ওপর তাকে সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হয়। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে বাড়িতে ফাটল বা ড্যাম্পের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
৩. সময়মতো হস্তান্তর না হওয়া অনেক সময় কোম্পানিগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারে না। কিস্তি শুরু হয়ে গেলেও যদি বাড়ি বুঝে পেতে দেরি হয়, তবে গ্রাহককে একদিকে নিজের থাকার জন্য ভাড়া বাসা বা বর্তমান আবাসের খরচ চালাতে হয়, আবার অন্যদিকে কিস্তির টাকাও গুনতে হয়। এটি গ্রাহকের ওপর দ্বিগুণ আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে।
৪. কঠিন শর্ত ও আইনি জটিলতা চুক্তিপত্রের অনেক সূক্ষ্ম বা ‘হিডেন’ শর্ত সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। যেমন— নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়লে কিস্তির টাকা বাড়বে কি না, কিংবা কোনো মাসে কিস্তি দিতে দেরি হলে কত শতাংশ জরিমানা দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দুই-তিনটি কিস্তি বকেয়া পড়লে কোম্পানি আইনিভাবে জমির ওপর দাবি বসানোর বা কাজ মাঝপথে বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিতে পারে।
৫. প্রতিষ্ঠানের নির্ভরযোগ্যতা বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো অনেক নতুন কোম্পানি এই প্রলোভন দেখিয়ে বাজার থেকে টাকা সংগ্রহ করছে। অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার বা পর্যাপ্ত মূলধন না থাকলে মাঝপথে কাজ ফেলে কোম্পানি উধাও হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
গ্রাহকের প্রতি বিশেষ পরামর্শ:
সরেজমিনে পরিদর্শন: কোম্পানি এর আগে যেসব বাড়ি করেছে, সেখানে গিয়ে মালিকদের সাথে কথা বলুন।
আইনি যাচাই: চুক্তির খসড়া অভিজ্ঞ কোনো আইনজীবীকে দিয়ে পড়িয়ে নিন। বিশেষ করে কিস্তি পরিশোধে দেরি হলে বা নির্মাণ দেরি হলে কী প্রতিকার পাওয়া যাবে তা নিশ্চিত করুন।
নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড নির্ধারণ: চুক্তিতে রড, সিমেন্ট, ইট এবং ফিটিংসে কোন ব্র্যান্ডের মালামাল ব্যবহার হবে তা নামসহ উল্লেখ রাখুন।
তদারকি: কিস্তিতে কাজ দিলেও মাঝেমধ্যে নিজে বা বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে কাজের মান তদারকি করান।
কিস্তিতে বাড়ি নির্মাণ নিঃসন্দেহে একটি বড় সুযোগ, তবে এটি ‘অন্ধবিশ্বাস’ করার মতো কোনো বিষয় নয়। আবেগের বশে চুক্তি না করে ঠান্ডা মাথায় লাভ-ক্ষতি ও ঝুঁকি বিবেচনা করলেই কেবল নিজের স্বপ্নের ঘরটি নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হবে।