আধুনিক কৃষিব্যবস্থায় ফসলের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কীটনাশক এখন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুলা চাষ থেকে শুরু করে সবজি উৎপাদন—সবখানেই ফলন রক্ষা এবং কৃষকের আয় স্থিতিশীল রাখতে এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। তবে গত কয়েক দশক ধরে আলোচনা কেবল ‘কী পরিমাণ কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে’ তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বর্তমানে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসছে: এই সুরক্ষার পরিবেশগত মূল্য কত এবং শেষ পর্যন্ত এই দায়ভার কে বহন করছে?
বিষাক্ততার তীব্রতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক কৃষি অঞ্চলে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশগত ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় এখন আর শুধু ব্যবহারের পরিমাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং যুক্ত হয়েছে ‘বিষাক্ততার তীব্রতা’ (Toxicity Intensity)। কীটনাশকের মিশ্রণ পতঙ্গ, মাটির অণুজীব এবং জলজ প্রাণীর জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা এখন বড় দুশ্চিন্তার কারণ। এমনকি মোট ব্যবহার খুব ধীরে বাড়লেও, শক্তিশালী রাসায়নিক ফর্মুলেশনের কারণে জৈবিক ক্ষতির সম্ভাবনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অদৃশ্য কৃষি অর্থনীতির সংকট
পাকিস্তানের মতো কৃষিপ্রধান দেশগুলোর জন্য এটি কেবল পরিবেশগত বিতর্ক নয়, বরং খামার ব্যবস্থাপনা ও কৃষি অর্থনীতির একটি গভীর সংকট। কৃষি উৎপাদন মূলত পরাগায়নকারী পতঙ্গ, মাটির মাইক্রো-অর্গানিজম এবং উপকারী পোকামাকড়ের মতো প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এগুলো সরাসরি কৃষকের বাজেটে স্থান না পেলেও নীরবে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখে। যখন কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে এই প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন কৃষকরা দ্বিতীয় পর্যায়ের বা নতুন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণের শিকার হন। এর ফলে তারা আরও বেশি স্প্রে করতে বাধ্য হন, যা শেষ পর্যন্ত একটি ‘রাসায়নিক নির্ভরতা চক্র’ তৈরি করে।
মাটির উর্বরতা ও আর্থিক প্রভাব
মাটির জৈবিক কার্যকলাপ এই রাসায়নিকের প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটির অণুজীবগুলো পুষ্টি চক্র, মাটির গঠন এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এগুলোর বিনাশ ঘটলে সারের কার্যকারিতা কমে যায় এবং ফলন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ে কিন্তু মুনাফা কমে আসে। পাকিস্তানের শস্য খাতে গত দুই দশকে কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমাগত বেড়েছে, যার বড় কারণ হলো সঠিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অভাব এবং কীটনাশক বিক্রেতাদের ওপর কৃষকদের অতিরিক্ত নির্ভরতা।
আন্তর্জাতিক বাজার ও রফতানি চ্যালেঞ্জ
বর্তমান বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ (Residue) এবং টেকসই উৎপাদন নিয়ে কড়া নিয়ম মানা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রফতানি করা পণ্য নির্ধারিত সীমার বেশি রাসায়নিক পাওয়ায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে। ফলে পাকিস্তানের উদ্যানজাত এবং বিশেষ শস্য রফতানিকারকদের জন্য কীটনাশক ব্যবস্থাপনা এখন কেবল নিয়মের বিষয় নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার প্রধান শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সমাধানের পথ: সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM)
সমাধান হিসেবে কীটনাশককে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়, কারণ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ফসলের সুরক্ষা প্রয়োজন। আসল সমাধান লুকিয়ে আছে কীটনাশকের পরিমিত ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহারের মধ্যে।
সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM): রুটিন অনুযায়ী স্প্রে না করে নিয়মিত মাঠ পর্যবেক্ষণ, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট মাত্রায় রাসায়নিক ব্যবহার করতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার: পেস্ট অ্যালার্ট প্ল্যাটফর্ম, স্যাটেলাইট মনিটরিং এবং প্রিসিশন স্প্রেয়িং টুলের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো সম্ভব।
ডেটা ও প্রশিক্ষণ: দীর্ঘমেয়াদী তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং কৃষকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রূপান্তর সফল করা সম্ভব।
কৃষিকে পরিবেশ থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। পরিবেশগত ভিত্তি দুর্বল হলে কৃষি অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের পছন্দ এখন আর কেবল ‘উৎপাদন বনাম সুরক্ষা’ নয়, বরং ‘স্বল্পমেয়াদী রাসায়নিক নির্ভরতা বনাম দীর্ঘমেয়াদী কৃষি স্থিতিস্থাপকতা’। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নিলে জীববৈচিত্র্য এবং কৃষকের লাভ—উভয়ই রক্ষা করা সম্ভব।
লেখক: মানান আসলাম। স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট, জিয়াংসু ইউনিভার্সিটি, চীন এবং কৃষি ব্যবসা ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন বিভাগ, এমএনএস-কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মুলতান, পাকিস্তানের সাথে যুক্ত।
আরও নিয়মিত খবরের আপডেট পেতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং আপনার মূল্যবান মতামত দিয়ে আমাদের সাথে থাকুন।