মোস্তফা তারেক, নিউইয়র্ক: আধুনিক প্রযুক্তির যুগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব তুলে দেওয়া যতটা সহজ, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ততটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর হাজার হাজার শিশু ‘অনলাইন গ্রুমিং’-এর শিকার হচ্ছে। অপরাধীরা কোনো শারীরিক বলপ্রয়োগ ছাড়াই কেবল ইন্টারনেটের মাধ্যমে শিশুদের মন জয় করে তাদের চরম বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
অনলাইন গ্রুমিং হলো একটি সুপরিকল্পিত মানসিক প্রক্রিয়া, যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধী কোনো শিশুর সাথে ইন্টারনেটে সুসম্পর্ক বা বন্ধুত্ব স্থাপন করে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শিশুটিকে যৌন শোষণ, পর্নোগ্রাফি তৈরি বা পাচারের উদ্দেশ্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত করা।
অপরাধীদের কৌশলী ধাপসমূহ-
তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই (FBI)-এর মতে, গ্রুমিং সাধারণত তিনটি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হয়:
অপরাধীরা এমন সব প্ল্যাটফর্মে সক্রিয় থাকে যেখানে শিশুরা বেশি সময় কাটায়। তারা শিশুর প্রোফাইল দেখে তার পছন্দ-অপছন্দ, একাকীত্ব বা পারিবারিক সমস্যার সুযোগ খোঁজে। অনেক সময় অপরাধীরা ফেক প্রোফাইল ব্যবহার করে নিজেদের সমবয়সী কিশোর বা কিশোরী হিসেবে পরিচয় দেয়।
বিশ্বাস ও নির্ভরতা তৈরি
এটি সবচেয়ে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অপরাধী শিশুটিকে প্রচুর সময় দেয়, তার প্রশংসা করে এবং তার ‘সেরা বন্ধু’ হয়ে ওঠে।
- উপহার: অনলাইন গেমে দামী ‘স্কিন’, ‘কারেন্সি’ বা সরাসরি ডিজিটাল গিফট কার্ড পাঠিয়ে শিশুকে প্রলুব্ধ করা হয়।
- আবেগীয় সমর্থন: শিশুটির মা-বাবা বা বন্ধুদের সাথে কোনো সমস্যা থাকলে অপরাধী নিজেকে একমাত্র শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে উপস্থাপন করে।
যৌন শোষণ ও ব্ল্যাকমেইল:
একবার বিশ্বাস অর্জন করলে অপরাধী ভিডিও চ্যাটে আসার বা ব্যক্তিগত (নগ্ন) ছবি পাঠানোর অনুরোধ করে। শিশুটি একবার ছবি পাঠিয়ে দিলে শুরু হয় আসল ভয়াবহতা।
ব্ল্যাকমেইল: ছবিগুলো ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার বা মা-বাবাকে দেখানোর ভয় দেখিয়ে আরও আপত্তিকর কাজ করতে বাধ্য করা হয়।
শারীরিক মিলনের প্রস্তাব: অনেক ক্ষেত্রে অনলাইনে শুরু হওয়া এই সম্পর্ক সরাসরি দেখা করার এবং শারীরিক নির্যাতনের দিকে মোড় নেয়।
পরিসংখ্যানের ভয়াবহ চিত্র (যুক্তরাষ্ট্র প্রেক্ষাপট)
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা ও প্রতিকার: মনোবিজ্ঞানীদের মতে, গ্রুমিংয়ের শিকার শিশুরা হঠাৎ করে চুপচাপ হয়ে যায়, ডিভাইস ব্যবহারের সময় অতিমাত্রায় গোপনীয়তা অবলম্বন করে এবং খাবার বা ঘুমে অনিয়ম দেখা দেয়।
সুরক্ষায় করণীয়:
ডিজিটাল লিটারেসি: শিশুকে শেখাতে হবে যে ইন্টারনেটে ‘অপরিচিত’ মানেই সে বিপজ্জনক হতে পারে, এমনকি সে যদি নিজেকে সমবয়সী দাবি করে তবুও।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল: শিশুদের ডিভাইসে নিরাপত্তা ফিল্টার এবং সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া।
খোলামেলা আলোচনা: শিশুদের এমন ভরসা দেওয়া যেন তারা কোনো ভুল করে ফেললেও ভয় না পেয়ে মা-বাবাকে জানাতে পারে।
“অপরাধীরা শিশুদের বেডরুমে ঢুকে পড়ছে তাদের স্ক্রিনের মাধ্যমে। মা-বাবাকে এখন ঘরের দরজার পাশাপাশি ইন্টারনেটের দরজাতেও পাহারা দিতে হবে।” — সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ।










