অদূরদর্শী পরিকল্পনা:চরম বিপর্যয়
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: প্রকৃতির প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রাণীরও যে বাস্তুসংস্থানে নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে, তা উপেক্ষা করা হলে ভয়াবহ পরিণতি নেমে আসতে পারে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চীনের তৎকালীন সরকার মশা, মাছি, ইঁদুর এবং বিশেষ করে চড়ুই পাখি নির্মূলের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়।
উদ্দেশ্য ছিল জনস্বাস্থ্য রক্ষা এবং শস্যের উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু এই “অপরিণামদর্শী পরিকল্পনা” শেষ পর্যন্ত চীনের ইতিহাসে অন্যতম বড় মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে।
অভিযানের নেপথ্য কারণ
তৎকালীন চীনা নেতৃত্বের ধারণা ছিল, চড়ুই পাখি প্রচুর পরিমাণে শস্য খেয়ে ফেলে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি। হিসাব করা হয়েছিল যে, প্রতিটি চড়ুই বছরে প্রায় ৪.৫ কেজি শস্য খায়। এই যুক্তিতে দেশজুড়ে চড়ুই নিধনের এক ব্যাপক উন্মাদনা শুরু হয়।
যেভাবে পরিচালিত হয়েছিল এই নিধনযজ্ঞ
পুরো দেশের জনগণকে এই অভিযানে নামিয়ে দেওয়া হয়। ড্রাম বাজিয়ে, থালাবাসন পিটিয়ে চড়ুইদের আকাশে উড়তে বাধ্য করা হতো যতক্ষণ না তারা ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়ে মারা যেত। তাদের বাসা ভেঙে ফেলা এবং গুলি করে মারা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
সরকার এমনকি সফল শিকারিদের পুরস্কৃতও করত। ফলে কয়েক মাসের মধ্যে চীনের চড়ুই পাখির সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
প্রকৃতির পাল্টা আঘাত এবং মহাদুর্ভিক্ষ
চড়ুই নিধনের পরপরই পরিবেশের ভারসাম্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। চড়ুইরা কেবল শস্যই খেত না, তারা প্রচুর পরিমাণে ফসলের ক্ষতিকারক পোকা এবং পঙ্গপালও খেয়ে ফেলত। চড়ুই কমে যাওয়ায় পঙ্গপালদের কোনো প্রাকৃতিক শিকারি থাকল না।
ফলস্বরূপ, পঙ্গপালের বিশাল বাহিনী চীনের শস্যক্ষেতগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। এর ফলে যে ফসল চড়ুইদের হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ফসল পঙ্গপাল খেয়ে সাবাড় করে দেয়। এই পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা এবং সেই সঙ্গে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শুরু হয় ‘গ্রেট চাইনিজ ফেমিন’ বা মহাদুর্ভিক্ষ, যাতে প্রায় ১৫ থেকে ৪৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
শিক্ষা এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
পরবর্তীতে সরকার ভুল বুঝতে পেরে চড়ুই নিধন বন্ধ করে এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে চড়ুই আমদানি করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা বা বাস্তুসংস্থানে মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপ কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
বর্তমানে চীনের মতো অনেক দেশই তাদের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কঠোর আইন প্রণয়ন করছে। তবে ইতিহাসের এই শিক্ষাটি আজও প্রাসঙ্গিক: প্রতিটি প্রজাতির নিজস্ব মূল্য রয়েছে এবং তাদের বিনাশ করার প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত মানবজাতির জন্যই বিপর্যয় ডেকে আনে।
আমাদের নিয়মিত আপডেট পেতে এবং পরিবেশ ও প্রকৃতি নিয়ে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে businesstoday24.com ফলো করুন এবং নিচে মন্তব্য করুন।