কৃষ্ণা বসু, কলকাতা: বিশ্বজুড়ে বাণিজ্যিক উত্তেজনার পারদ চড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে ভারতীয় চা শিল্প। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা দেশগুলোর ওপর ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের হুমকিতে ভারতের চা রপ্তানিকারকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে অর্থোডক্স চায়ের অন্যতম প্রধান গন্তব্য ইরানে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন উৎপাদনকারীরা।
সংকটের মূলে ট্রাম্পের নতুন নীতি
গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন এক কড়া হুঁশিয়ারিতে জানিয়েছে, যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাবে, তাদের যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক (Tariff) গুণতে হতে পারে।
মূলত তেহরানকে অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করতেই এই ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা শুল্ক যুদ্ধের কৌশল নিয়েছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট।
ইরানে ভারতীয় চায়ের বাজার চিত্র
ভারতীয় চা শিল্পের জন্য ইরান একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাজার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ভারত প্রতিবছর মোট চা রপ্তানির প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ ইরানে পাঠিয়ে থাকে।
রপ্তানির পরিমাণ: ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ভারত থেকে ইরানে বার্ষিক প্রায় ৩১ মিলিয়ন (৩.১ কোটি) কেজি চা রপ্তানি হয়েছে।
আর্থিক মূল্য: এর আর্থিক মূল্যমান প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।
চায়ের ধরন: ইরান মূলত প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ‘অর্থোডক্স’ চায়ের বড় ক্রেতা। আসাম ও দক্ষিণ ভারতের নীলগিরি অঞ্চলের চা বাগানগুলো এই রপ্তানির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
কেন চিন্তিত রপ্তানিকারকরা?
ভারতীয় চা রপ্তানিকারক সমিতির (ITEA) মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে ব্যাংকগুলো এখন থেকেই ইরানের সঙ্গে লেনদেনে অনীহা দেখাচ্ছে।
১. পেমেন্ট জটিলতা: ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আসলে পুরোনো রুপি-রিয়াল পেমেন্ট মেকানিজম অচল হয়ে যেতে পারে।
২. শিপিং সংকট: অনেক আন্তর্জাতিক কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ইরানি বন্দরে মালামাল নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
৩. মার্কিন বাজার বনাম ইরান: রপ্তানিকারকদের সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন— হয় ইরানের ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বাজার ধরে রাখা, না হয় ২৫ শতাংশ বাড়তি শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাজারে টিকে থাকা।
সরকারি অবস্থান
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে কূটনীতিকরা মনে করছেন, ইরানের চাবাহার বন্দরের মতো কৌশলগত প্রকল্পের স্বার্থে ভারত হয়তো বিশেষ ছাড়ের চেষ্টা করবে। কিন্তু ট্রাম্পের ‘অপ্রত্যাশিত’ বাণিজ্য নীতির মুখে আপাতত কোনো আশার আলো দেখছেন না চা সংশ্লিষ্টরা।
ইতোমধ্যেই নিলাম কেন্দ্রগুলোতে ইরানে পাঠানোর উপযোগী চায়ের চাহিদা কমতে শুরু করেছে, যা অভ্যন্তরীণ বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সারণি: ভারত থেকে ইরানে চা রপ্তানির তুলনামূলক চিত্র (২০২৩-২০২৬)
নিচের টেবিলে গত তিন বছরের প্রকৃত তথ্য এবং ২০২৬ সালের জন্য সম্ভাব্য প্রভাবের একটি চিত্র দেওয়া হলো:
| বছর | রপ্তানির পরিমাণ (মিলিয়ন কেজি) | প্রধান চায়ের ধরন | বাজারের অবস্থা/চ্যালেঞ্জ |
| ২০২৩ | ২৬.৫ | অর্থোডক্স | রুপি-রিয়াল পেমেন্ট মেকানিজম চালু ছিল। |
| ২০২৪ | ৩১.২ | অর্থোডক্স ও সিটিসি | চাহিদা বৃদ্ধি পায়, পেমেন্টে কিছুটা ধীরগতি। |
| ২০২৫ | ২৯.৮ | উচ্চমানের অর্থোডক্স | লোহিত সাগরে সংকটের কারণে জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি। |
| ২০২৬ (পূর্বাভাস) | ১৮.০ – ২০.০ | সীমিত অর্থোডক্স | ট্রাম্পের শুল্ক নীতি ও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি। |










