দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একসময়ের প্রভাবশালী এই প্রতিষ্ঠানটি গত কয়েক দশকে তার জৌলুস ও কার্যকারিতা হারিয়েছে বলে মনে করছেন সাধারণ ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চেম্বারটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলেও আইনি জটিলতায় নির্বাচন আটকে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামের আপামর ব্যবসায়ী সমাজ আবারও ঐক্যবদ্ধ একটি চেম্বারের স্বপ্ন দেখছেন, যেখানে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তারা তাকিয়ে আছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দিকে।
গৌরবময় অতীত ও কক্ষপথ বিচ্যুতি
চিটাগাং চেম্বারের ইতিহাস কেবল চট্টগ্রামের নয়, বরং গোটা উপমহাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসের সাথে সম্পৃক্ত। পাকিস্তান আমলে জাতীয় বাজেট প্রণয়নে এই চেম্বারের সুপারিশমালা ছিল অপরিহার্য। মির্জা আহমদ ইস্পাহানি, এ. কে. খান, মাহমুদুন্নবী চৌধুরী, আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবু এবং আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর মতো প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বরা বিভিন্ন সময়ে এই চেম্বারের হাল ধরেছিলেন। তাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে চেম্বারটি হয়ে উঠেছিল নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এক পর্যায়ে চেম্বারটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা পরিবারের প্রভাব বলয়ে বন্দি হয়ে পড়ে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নির্বাচনের পরিবর্তে সিলেকশন কালচার জেঁকে বসায় প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এর ফলে বড় বড় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা চেম্বার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন এবং অনেকটা বাধ্য হয়েই গঠন করেন মেট্রোপলিটন চেম্বার। কিন্তু কার্যত দুটি চেম্বার থাকায় চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের দাবি আদায়ের শক্তি খণ্ডিত হয়ে পড়ে।
বর্তমান সংকট ও স্থবিরতা
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও সরকার পরিবর্তনের পর চিটাগাং চেম্বার আপাতদৃষ্টিতে মুক্ত হলেও জটিলতা কাটেনি। দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন না হওয়া এবং বর্তমানে মামলার জালে আটকে বারে বারে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে যাওয়ায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
পর্যবেক্ষক মহলের মতে, এই অচল অবস্থা চলতে থাকলে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ রক্ষা তো দূরের কথা, চেম্বারের অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে।
ঐক্যের ডাক ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ভূমিকা
বর্তমান এই ক্রান্তিকালে সাধারণ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে, চট্টগ্রামের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারে সকল ব্যবসায়ীর একক মঞ্চে ফেরা প্রয়োজন। অর্থাৎ, চিটাগাং চেম্বার ও মেট্রোপলিটন চেম্বারকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, এই ঐক্য প্রক্রিয়া সফল করতে পারেন একমাত্র অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। সফল ব্যবসায়ী নেতা এবং আধুনিক বাণিজ্য নীতির রূপকার হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা দলমত নির্বিশেষে সবার কাছে অপরিসীম। তার সময়ে চেম্বার যেভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে চট্টগ্রামের অবস্থান তুলে ধরেছিল, সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে পারেন।
চট্টগ্রামের শীর্ষ শিল্পপতিদের বিশ্বাস, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সরাসরি হস্তক্ষেপ ও অভিভাবকত্ব পেলে আইনি জটিলতা কাটিয়ে একটি স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে সকল স্তরের ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করা সম্ভব।
চট্টগ্রামের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী মহলে চট্টগ্রামের জোরালো অবস্থান নিশ্চিত করতে “ঐক্যবদ্ধ চেম্বার” এখন আর কেবল সম্ভাবনা নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আর এই লড়াইয়ে কাণ্ডারি হিসেবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকেই বেছে নিতে চাইছেন বন্দরনগরীর ব্যবসায়ী সমাজ।