বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: আন্তর্জাতিক শিপিং খাতের অস্থিরতায় সিঙ্গাপুর, কলম্বো এবং ভারতের মুন্দরা বন্দরে তীব্র জট তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে অনেক মাদার ভ্যাসেল গন্তব্যে না গিয়ে এই হাবগুলোতে কার্গো খালাস করে ফিরে যাচ্ছে। ফলে কনটেইনারের পাহাড় জমেছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে।
বিভিন্ন শিপিং কোম্পানির নির্বাহিরা জানান, বেশ কিছু শিপিং লাইন ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে যাতে তাদের মধ্যপ্রাচ্যগামী কন্টেইনারগুলো সাময়িকভাবে সিঙ্গাপুর বন্দরে রাখা হয়। যুদ্ধাবস্থার কারণে জাহাজগুলো সরাসরি গালফ অঞ্চলের (পারস্য উপসাগর) বন্দরে যেতে পারছে না। ফলে সিঙ্গাপুরকে একটি বিকল্প ‘স্টেজিং পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছে তারা।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: নৌ-বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ ও ভেসপুচি মেরিটাইমের প্রধান নির্বাহী লার্স জেনসেন সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে জানিয়েছেন, এই পরিস্থিতির কারণে এশিয়ার বন্দরগুলোতে দীর্ঘস্থায়ী পণ্যজট সৃষ্টি হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, “বর্তমান পরিস্থিতি ২০২৩ সালের হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণের পরবর্তী সংকটের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখন হঠাৎ করেই গন্তব্যে পণ্য পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।”
তার মতে, অনেক কন্টেইনার যা সরাসরি গালফ অঞ্চলে যাওয়ার কথা ছিল, তা এখন সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার বন্দরে এসে জমা হচ্ছে। এতে এসব বন্দর ‘বটলনেক’ বা পণ্যজটের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আটকে পড়া জাহাজ ও ক্যাপাসিটি সংকট: লাইনারলিটিকার বিশ্লেষক তান হুয়া জু জানিয়েছেন, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে প্রায় ১৩২টি কন্টেইনার জাহাজ আটকা পড়ে আছে। তা বিশ্বের মোট নৌ-বহরের প্রায় ১.৪ শতাংশ। যদি হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে, তবে বিশ্বব্যাপী জাহাজের সংকট দেখা দেবে এবং পণ্য পরিবহন খরচ আকাশচুম্বী হবে। বিশেষ করে কলম্বো ও হাম্বানটোটা বন্দর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়বে।
বিরাজমান পরিস্থিতির কারণে বীমা প্রিমিয়াম এবং ‘ওয়ার রিস্ক কভার’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকির খরচ বাড়তে শুরু করেছে। লার্স জেনসেনের মতে, গালফ অঞ্চলের পণ্য পরিবহনের স্পট রেট দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাব বিশ্বের অন্যান্য প্রধান সমুদ্রপথেও পড়বে। এছাড়া তেলের দাম বাড়ার ফলে শিপিং কোম্পানিগুলো বাড়তি ‘বাঙ্কার সারচার্জ’ আরোপ করছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপ তৈরি করবে।
সিঙ্গাপুর ভিত্তিক শিপিং লাইন ‘ওশেন এশিয়া লজিস্টিকস’ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে জাহাজগুলোকে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে গড়ে ৮ দিন বেশি বন্দরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। মাদার ভ্যাসেল থেকে ফিডার ভ্যাসেলে পণ্য স্থানান্তরের এই ধীরগতি পুরো সাপ্লাই চেইনকে এলোমেলো করে দিয়েছে।
কলম্বো বন্দরে জাহাজ বাঞ্চিং বা একসঙ্গে অনেক জাহাজ ভিড় করায় কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে নজিরবিহীন জট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, তা এখনই বলা কঠিন।
এই সংকটের সরাসরি ভুক্তভোগী বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় এক রপ্তানিকারক ও পোশাক শিল্প মালিক বলেন, সময়মতো কাঁচামাল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, তৈরি পণ্য বিদেশে পাঠাতে গিয়ে মাদার ভ্যাসেল মিস হওয়ার কারণে ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছাতে পারছি না। বায়ারদের আস্থা ধরে রাখতে অনেক সময় বাধ্য হয়ে আকাশপথে পণ্য পাঠাচ্ছি, যাতে আমাদের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাচ্ছে।
চট্টগ্রামভিত্তিক আরেক পোশাক রপ্তানিকারক জানান, লিড টাইম ১০ দিন বেড়ে যাওয়ায় বায়াররা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য না পৌঁছাতে পারায় অর্ডার বাতিলের হুমকিও আসছে। বন্দরের এই জট কেবল একটি শিপিং ইস্যু নয়, এটি আমাদের পুরো রপ্তানি অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কনটেইনার সিঙ্গাপুর বা কলম্বো হয়ে পরিবাহিত হয়। এই হাবগুলোতে জট থাকার অর্থ হলো বিশ্ববাজারের সাথে বাংলাদেশের সংযোগস্থল বাধাগ্রস্ত হওয়া। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লোহিত সাগরের সংকটের কারণে জাহাজগুলো দীর্ঘ পথ ঘুরে আসায় জ্বালানি খরচ ও সময় দুটোই বেড়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
businesstoday24.com ফলো করুন।