Home Third Lead হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা: কবরের মাটি ছুঁয়ে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ

হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা: কবরের মাটি ছুঁয়ে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ

ছবি সংগৃহীত

বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, ঢাকা: রাজধানীর আকাশ আজ কুয়াশাচ্ছন্ন, কিন্তু মানুষের মনের মেঘ তার চেয়েও অনেক বেশি ভারী। শেরেবাংলা নগরের জিয়া উদ্যান আজ শুধু একটি সমাধিস্থল নয়, বরং হয়ে উঠেছে লাখো মানুষের শোকের মিলনমেলা।

গত মঙ্গলবার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তার কবরে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ।

সকাল থেকেই জিয়া উদ্যানের প্রধান ফটকে ভিড় বাড়তে থাকে। নিরাপত্তার স্বার্থে শুরুতে প্রবেশাধিকার কিছুটা সীমিত থাকলেও, দুপুর ১২টার পর খুলে দেওয়া হয় ফটক। বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ ছুটে যান তাদের প্রিয় নেত্রীর শেষ শয্যার পাশে। কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখার জন্য সাধারণ মানুষের যে আকুলতা, তা রাজনৈতিক পরিচয়কে ছাপিয়ে মানবিক এক রূপ নিয়েছে।

 সাধারণ মানুষের কান্নায় আজ ভারী হয়ে উঠেছে উদ্যানের বাতাস। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের চোখেমুখে ছিল হারানো স্বজনের শোক। নারায়ণগঞ্জের বৃদ্ধ রমিজ উদ্দিন এসেছেন লাঠিতে ভর দিয়ে। তিনি বলেন, “ম্যাডামকে একবার দেখতে পারি নাই যখন অসুস্থ ছিলেন। আজ  বিদায় জানাতে আইছি। মনটা মানতেছে না যে আপা আর নাই।”

দোহার থেকে আসা গৃহিণী মরিয়ম বেগম আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, “নারীদের অধিকারের জন্য তিনি সবসময় ভাবতেন। আমরা একজন অভিভাবক হারালাম। উনার কবরটা ছুঁয়ে মনে হলো নিজের মাকেই বিদায় জানালাম।”

কালীগঞ্জের যুবক আরিফ, যিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত নন, তিনি এসেছেন কেবল শ্রদ্ধাবোধ থেকে। তার ভাষায়, “রাজনীতি বড় কথা না, তিনি এই দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার এই চলে যাওয়া মেনে নেওয়া কষ্টের।”

ফেনীর পরশুরাম থেকে এসেছেন বৃদ্ধা সালেহা খাতুন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ক্লান্ত এই বৃদ্ধা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদছিলেন। তিনি বলেন, “আমার বাড়ির মেয়েরে বিদায় দিতে আসছি। মাটি দিয়া গেলাম, এখন আল্লাহ যেন উনারে শান্তিতে রাখেন।”

নিঃশব্দ মোনাজাত ও পুষ্পস্তবক:

বেলা বাড়ার সাথে সাথে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ ফুল হাতে এনেছেন, কেউবা কেবল দুহাত তুলে মোনাজাত করছেন। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সূরা পাঠ আর কান্নার শব্দে এক হাহাকারময় পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

পুলিশ সদস্য নজরুল জানালেন, কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলেও মানুষের আবেগ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তবে সবাই সুশৃঙ্খলভাবে তাদের শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন।

গতকাল বুধবার জানাজায় যে জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়েছিল, তার রেশ আজ কবরের পাশেও বিদ্যমান। দল-মত নির্বিশেষে সবাই আজ এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন— প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো পরম মমতায় বিদায় জানাতে। জিয়াউর রহমানের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ‘আপসহীন’ এই নেত্রী, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে তিনি রয়ে গেলেন অমলিন।