- তিন-চার দশক আগের তথ্যের দুর্ভেদ্য দেয়াল বনাম বর্তমানের এক ক্লিকের সহজলভ্যতা।
- সরকারি দপ্তরে দিনের পর দিন ধরনা, অপেক্ষা এবং জনসংযোগ কর্মকর্তাদের সেই হাবভাব।
- একজন ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তার সাহসী সহায়তায় অতীব গোপনীয় ফাইল পর্যালোচনা ও বিশাল কেলেঙ্কারি ভণ্ডুল।
কামরুল ইসলাম: আজকের সংবাদকর্মী বা সাধারণ মানুষ যখন স্মার্টফোনের স্ক্রিনে একটি ক্লিক করেই কাঙ্ক্ষিত তথ্য পেয়ে যান, তখন তিন-চার দশক আগের সেই দিনগুলোর কথা ভাবলে একে রূপকথা মনে হতে পারে। তখন তথ্য কোনো পাবলিক প্রপার্টি ছিল না, বরং তা ছিল নীতিনির্ধারকদের কাছে সযত্নে আগলে রাখা এক ‘গুপ্তধন’। তথ্য পাওয়া ছিল অনেকটা সোনার হরিণ শিকারের মতো কঠিন। আজকের ডেক্স-নির্ভর সাংবাদিকতার যুগে সেই মাঠের লড়াই আর ধৈর্যের পরীক্ষা কল্পনা করাও কঠিন।
সেই সময়ে একটি সাধারণ পরিসংখ্যান বা তথ্যের জন্যও সরকারি অফিসের বারান্দায় দিনের পর দিন ধরনা দিতে হতো। কর্মকর্তারা যেন এক একটি তথ্যের ওপর অদৃশ্য পর্দা টেনে রাখতেন। সামান্য বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলেও এমনভাবে তাকাতেন যেন কোনো রাষ্ট্রীয় কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে ফাইল ঘুরত, আর সাংবাদিকরা ঘুরতেন কর্মকর্তাদের পেছনে। ‘উপরমহলের অনুমতি নেই’ কিংবা ‘স্যার মিটিংয়ে আছেন’—এসব ছিল তথ্য না দেওয়ার চিরচেনা অজুহাত। পিএ-র কক্ষ থেকে জনসংযোগ বিভাগ পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ করতে করতে সপ্তাহ পার হয়ে যেত, তবুও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত তথ্যের দেখা মিলত না। তবে অবাক করা বিষয় হলো, সেই সময়ে সাংবাদিকদের প্রতি কর্মকর্তাদের এক ধরণের সহজাত সমীহ ছিল, যা আজকের ডিজিটাল যুগে অনেকটাই অনুপস্থিত।
সেই সময়ে তথ্যের ওপর এমন এক অদৃশ্য পর্দা দেওয়া থাকত, যেন সামান্য কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ পেলেই মহা কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। যেসব তথ্য সংগ্রহের জন্য তখন কয়েক দিন বা সপ্তাহ পার হয়ে যেত, অথবা আদৌ মিলত না, আজ তা কেবল এক সেকেন্ডের দূরত্বে। তবে সব কর্মকর্তা এক ছিলেন না, কেউ কেউ ছিলেন নীতিবান ও সাহসী। আমার পেশাগত জীবনের এমনই এক রোমাঞ্চকর ঘটনার কথা মনে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের বিপুল পরিমাণ জায়গা একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়ার এক বিশাল কেলেঙ্কারির খবর আমি পেয়েছিলাম। কিন্তু দালিলিক প্রমাণ ছাড়া তা প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।
কয়েক দিনের ব্যর্থতা ও ঘুরাঘুরির এক পর্যায়ে আমার ঘনিষ্ঠ একজন মধ্যম সারির কর্মকর্তা বিষয়টি জানতে পারেন। সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে তিনি এক অভাবনীয় ব্যবস্থা করেন। তিনি দাপ্তরিক স্টাডির প্রয়োজনে অন্য অফিস থেকে সেই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ফাইলটি রিকুইজিশন দিয়ে নিজের অফিসে আনান। এরপর ফাইলটি নিজের গাড়িতে করে বাসায় নিয়ে যান কেবল আমাকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ দিতে। যথাসময়ে তার বাসায় পৌঁছে যাই। তখন মোবাইল ফোন কেবল চালু হয়েছে, স্মার্টফোনের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। সেই রাতে টানা ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ধরে নিবিড়ভাবে ফাইলটি স্টাডি করে আমি প্রয়োজনীয় সব তথ্য নোট করে নিই। কাজ শেষে গভীর রাতে সেই কর্মকর্তার গাড়িতে করেই আমাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
পরদিন সারাদিন আরও কিছু আনুষঙ্গিক অনুসন্ধান শেষে প্রতিবেদনটি তৈরি করি এবং তা সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরপরই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অশুভ সিন্ডিকেটের চক্রান্ত ভণ্ডুল হয়ে যায়। বর্তমানের তথ্য অধিকার আইন ও ইন্টারনেটের অবাধ সুযোগ সাংবাদিকতার গতি বাড়ালেও, সেই হার না মানা সংগ্রামের দিনগুলো আজও অমলিন। তথ্যের জন্য সেই যে সাধনা আর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সত্য প্রকাশের তৃপ্তি, তা আজকের কীবোর্ড-নির্ভর সাংবাদিকতায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
বিজনেস টুডে ২৪ ডটকম-এর সাথেই থাকুন। নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের পেজটি ফলো করুন এবং তথ্য প্রাপ্তির এই আমূল পরিবর্তন ও আপনার সাংবাদিকতা জীবনের কোনো স্মৃতি থাকলে তা জানান।
businesstoday24.com










