নয়ন দাস, কুড়িগ্রাম: ব্রহ্মপুত্র, ধরলা আর দুধকুমারের চরাঞ্চলবেষ্টিত উত্তরের সীমান্ত জেলা কুড়িগ্রামে কনকনে শীতের মাঝেও এখন বইছে নির্বাচনী উত্তাপ। তবে এবারের উত্তাপটা অন্যবারের চেয়ে ভিন্ন। ভোটারদের হাতে এবার দুটি ব্যালট—একটি পছন্দের সংসদ সদস্য নির্বাচনের, অন্যটি রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে ‘জুলাই চার্টার’ বা গণভোটের।
১. চরাঞ্চলে প্রচারণার চিত্র
কুড়িগ্রামের ৪টি সংসদীয় আসনে বর্তমানে ২৬ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে (রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী) চরাঞ্চলের ভোটারদের মধ্যে গণভোট নিয়ে কৌতূহল সবচাইতে বেশি। নদীপথে নৌকায় করে প্রার্থীরা মাইকিং করার পাশাপাশি ‘গণভোট’ বা ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরছেন।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ৭০৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৩৮৬টি কেন্দ্রকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার বড় অংশই দুর্গম চরাঞ্চলে।
২. গণভোট নিয়ে সাধারণ মানুষের ভাবনা
ভোটের ধারণা: সদরের উলিপুর এলাকার কৃষক মো. আইয়ুব আলী বলেন, “আমরা তো এমপি চিনি, কিন্তু এবার শুনছি আইনের ভোটও নাকি দিতে হবে। নদীভাঙন রোধের কোনো আইন আছে কি না, সেটাই বড় কথা।”
সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি অংশ মনে করছেন, গণভোটের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিশ্চিত হলে ভবিষ্যতে আর ভোট চুরির ভয় থাকবে না।
সচেতনতা কর্মসূচি: গণভোট ও ‘জুলাই চার্টার’ (সংবিধান সংস্কার) নিয়ে কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি দূর করতে জেলা তথ্য অফিসের উদ্যোগে পথসভা ও লিফলেট বিতরণ চলছে। বিশেষ করে ‘দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী নয়’—এই বিধানটি তরুণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
৩. রাজনৈতিক কর্মীদের তৎপরতা
কুড়িগ্রামের ৪টি আসনেই বিএনপি, জামায়াত এবং জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) প্রার্থীরা সক্রিয়। আওয়ামী লীগ স্থগিত থাকায় তাদের প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র ও নতুন দলগুলোর প্রভাব বাড়ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোটের আহ্বানে সাড়া দিয়ে গ্রামগঞ্জে মিছিল বের করছেন। তাদের দাবি, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের মর্যাদা রক্ষায় এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়া জরুরি।
৪. চ্যালেঞ্জ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের ৬টি ভোটকেন্দ্রে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় রাতের নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে। তবে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার জানিয়েছেন, চরাঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি ফোর্স মোতায়েন থাকবে এবং ব্যালট বাক্স পরিবহনে স্পিডবোটের বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ
ছাড়া গুজব ঠেকাতে স্থানীয়ভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মঙ্গাপীড়িত এই জনপদের মানুষ এখন আর কেবল ভাতের নিশ্চয়তা নয়, ভোটের নিশ্চয়তাও চায়। কুড়িগ্রামের ভোটাররা মনে করছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির এই গণভোট হবে রাষ্ট্র সংস্কারের এক বড় পরীক্ষা।