বিজনেসটুডে২৪ প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম: জনসাধারণ, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কোনো প্রকার উন্মুক্ত পরামর্শ ছাড়াই ২৫ বছর মেয়াদি ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা ২০২৫’ (ইপিএসএমপি) অনুমোদনের উদ্যোগ নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকারের এই পদক্ষেপকে ‘অগণতান্ত্রিক ও অস্বচ্ছ’ আখ্যা দিয়ে চট্টগ্রামে এক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকালে বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)-এর উদ্যোগে এবং আইএসডিই বাংলাদেশ, প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন)-এর সহ-আয়োজনে এই কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
স্বৈরাচারী নীতির পুনরাবৃত্তির অভিযোগ
প্রতিবাদ সমাবেশে ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিই বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইন বলেন, “এই মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। এটি পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের অস্বচ্ছ ও দায়মুক্তিমূলক নীতি প্রণয়নেরই পুনরাবৃত্তি। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও কোনো অর্থবহ অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।”
পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি
বক্তারা অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় ‘এনার্জি ট্রানজিশন’-এর কথা বলা হলেও বাস্তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১৭ শতাংশ, যদিও কাগজে-কলমে ৪৪ শতাংশ দেখানো হয়েছে। আগামী ২৫ বছর পরও এলএনজি, কয়লা ও তেলের ওপর ৫০ শতাংশ নির্ভরতা বজায় রাখা হয়েছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনীতির জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।
সমাবেশে উত্থাপিত মূল আপত্তিসমূহ:
জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা: গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ১৫.৮ গিগাওয়াট থেকে বাড়িয়ে ২৫.২ গিগাওয়াট করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাস্তবতাবর্জিত প্রযুক্তি: হাইড্রোজেন ও কার্বন ক্যাপচার (সিসিএস)-এর মতো ব্যয়বহুল ও পরীক্ষামূলক প্রযুক্তিকে সমাধান হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা দেশকে নতুন ঋণ ও ভর্তুকির দিকে ঠেলে দেবে।
ড. ইউনূসের দর্শনের পরিপন্থী: ২০৫০ সালে কার্বন নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা ১৮৬.৩ MtCO₂e নির্ধারণ করা হয়েছে, যা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষিত ‘শূন্য কার্বন’ দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
নাগরিক সমাজের দাবি
প্রতিবাদ কর্মসূচি থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়: ১. অবিলম্বে ইপিএসএমপি ২০২৫ স্থগিত ও বাতিল করা। ২. বিশেষজ্ঞ ও জনগণের অংশগ্রহণে স্বচ্ছ জাতীয় পরামর্শ প্রক্রিয়া শুরু করা। ৩. ১০০% নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রণয়ন করা। ৪. ন্যায্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা।
সংহতি প্রকাশ
প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এম নাসিরুল হক, বিশিষ্ট নারী নেত্রী জেসমিন সুলতানা পারু, ডা. লুসি খান, মোহাম্মদ সেলিম জাহাঙ্গীর, ক্যাব নেত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস, সায়েরা বেগম, সাংবাদিক এম এ হোসেন, মোহাম্মদ জানে আলম, অধ্যক্ষ ইসমাইল ফারুকী প্রমুখ।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, এই পরিকল্পনা সংশোধন না করা হলে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি জনবিরোধী ও দায়মুক্তিমূলক নথি হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে।