Home Uncategorized সমুদ্রসৈকতে মিলল ডাইনোসর যুগের দানব

সমুদ্রসৈকতে মিলল ডাইনোসর যুগের দানব

ছবি সংগৃহীত

ফিচার:

 ১১ বছরের শিশুর আবিষ্কারে পাল্টে গেল ইতিহাস

আমিরুল মোমেনিন

ইংল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে সমারসেটের নীলগিরি পাহাড়ের নিচে বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ এমন কিছুর দেখা মিলবে, যা বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা বদলে দেবে—তা হয়তো কিশোরী রুবি রেনল্ডস কল্পনাও করেনি। কিন্তু বাস্তবে ঠিক সেটিই ঘটেছে। ২০২ মিলিয়ন বছর আগে সমুদ্র দাপিয়ে বেড়ানো এক অতিকায় সামুদ্রিক সরীসৃপের সন্ধান পেয়েছে সে, যার আকার শুনলে যে কেউ চমকে উঠতে পারেন

২০২০ সালের মে মাসের শেষ দিকে ১১ বছরের রুবি রেনল্ডস তার বাবা জাস্টিনের সাথে ব্লু অ্যাঙ্কর কাদা চরে ফসিল বা জীবাশ্ম খুঁজছিল। জাস্টিন প্রথমে চার ইঞ্চির একটি হাড়ের টুকরো পান। কিন্তু রুবি এর চেয়েও বড় একটি অংশ খুঁজে পায়, যা ছিল আগেরটির দ্বিগুণ। তারা জানতেন না যে, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সামুদ্রিক প্রাণী ‘ইচথিওটাইটান সেভারনেনসিস’ (Ichthyotitan severnensis) এর চোয়ালের অংশ।

পরবর্তীতে ব্রিস্টল এবং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যালিন্টোলজিস্ট (জীবাশ্মবিদ) ডিন লোম্যাক্স এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অনুধাবন করেন। তিনি ২০১৬ সালে সংগৃহীত অন্য একটি জীবাশ্মের সাথে এর মিল খুঁজে পান।

গবেষকদের মতে, এই সামুদ্রিক দানবটি ছিল প্রায় ৮২ ফুট (২৫ মিটার) লম্বা—যা বর্তমান সময়ের একটি নীল তিমির সমান। এটি ট্রায়াসিক যুগের (Triassic Period) শেষের দিকে সমুদ্রের রাজত্ব করত। বিজ্ঞানীরা এই প্রজাতিটির নাম দিয়েছেন ‘ইচথিওটাইটান সেভারনেনসিস’, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘সেভারন নদীর দানবীয় মাছ-টিকটিকি’।

প্রাণীটির বিশালত্বের কিছু নমুনা:

  • চোয়ালের দৈর্ঘ্য: প্রায় সাড়ে ৬ ফুটের বেশি।
  • মাথার খুলি: ধারণা করা হয় এটি ১০ ফুটেরও বেশি লম্বা ছিল।
  • ডানা বা ফ্লিপার: একটি বসার ঘরের সোফার চেয়েও চওড়া।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ট্রায়াসিক যুগের এই প্রাণীরা ডাইনোসরদের উত্থানের আগেই সমুদ্রের শীর্ষে অবস্থান করত। এদের হাড়ের অণুবীক্ষণিক গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এরা অন্যান্য সরীসৃপের তুলনায় দ্রুত এবং ভিন্ন পদ্ধতিতে বৃদ্ধি পেত। উষ্ণ রক্ত এবং জলজ পরিবেশে সরাসরি সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা এদের তিমিদের মতো শক্তিশালী করে তুলেছিল।

জীবাশ্মবিদ ডিন লোম্যাক্স বলেন, “এটি ভাবতেই অবাক লাগে যে, আজকের ব্রিটেনের উপকূলে একসময় নীল তিমির আকারের বিশাল সব ইচথিওসর সাঁতার কাটত। এই চোয়ালগুলো আমাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ভবিষ্যতে হয়তো কোনোদিন এদের পূর্ণাঙ্গ কঙ্কালও খুঁজে পাওয়া যাবে।”

বিবর্তনের এক অদ্ভুত অধ্যায়

আজ থেকে প্রায় ৯ কোটি ৪০ লক্ষ বছর আগে এই অতিকায় প্রাণীরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। এদের শূন্যস্থান পূরণ করতে পরবর্তীকালে প্লিয়োসর (Pliosaurs) এবং আরও পরে স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে তিমিদের আবির্ভাব ঘটে। বিবর্তনের ইতিহাসে এটি একটি চমৎকার উদাহরণ যে, প্রকৃতি কীভাবে বারবার একই ধরনের বিশালাকার শিকারি প্রাণী তৈরি করে।

সমারসেটের ক্ষয়িষ্ণু পাহাড়গুলো প্রতি শীতে ঝড়ের কবলে পড়ে নতুন নতুন রহস্য উন্মোচন করছে। রুবি এবং তার বাবার এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, বিজ্ঞানের বড় বড় অর্জন অনেক সময় সাধারণ মানুষের কৌতূহলী চোখের সামনেই লুকিয়ে থাকে। ১১ বছরের এক কিশোরীর হাত ধরে আজ উন্মোচিত হলো প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর এক বিস্ময়কর অধ্যায়।